হেবরনে দ্বিতীয় সপ্তাহে ইসরায়েলি অবরোধ: ঘরছাড়া ৪ হাজার ৯৬৯ জন, ১০ প্রবেশপথ বন্ধ
অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণের শহর হেবরনে ইসরায়েলি সামরিক অবরোধ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। আল জাজিরার ডেটা জার্নালিজম ইউনিটের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই অবরোধের ফলে প্রায় ৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
শুক্রবার পর্যন্ত নিজেদের বাড়ি থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৬৯ জনে। বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে রয়েছেন ৪৪১ জন বয়স্ক মানুষ, দুই বছরের কম বয়সী ৩৩৬ শিশু এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ৩১২ রোগী। এছাড়া ২০০ জনের বেশি গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারী এবং ৪৪ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও রয়েছেন।
পৌরসভার তথ্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আল জাজিরা জানিয়েছে, বর্তমানে ৭৮০টি পরিবার বাস্তুচ্যুত, যা শহরের ২ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দার প্রায় ২ শতাংশ।
হেবরনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি আল জাজিরাকে বলেছেন, হাজার হাজার নাগরিককে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্ব মধ্যরাতে শিশুদের কান্না দেখেছে। আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি হেবরনকে একটি গুরুতর, ব্যাপক অবরোধ ও যৌথ শাস্তির মুখে বলেও বর্ণনা করেছেন।
২৪ অক্টোবর মেয়র আল জাজিরাকে বলেছিলেন, বাস্তুচ্যুতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২০০। অর্থাৎ মাত্র দুই দিনে সংখ্যাটি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
সামরিক অবরোধ শুরু হয় শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, হেবরনে দুই ফিলিস্তিনি দুই ইসরায়েলি সৈন্যকে গুলি করে হত্যা ও আরও তিনজনকে আহত করার পর; সেনাবাহিনী পরে ওই দুই হামলাকারীকে হত্যা করে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দেন, তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে অবিলম্বে হেবরন বন্ধ করে দিতে এবং পুরো পশ্চিম তীরে পূর্ণ লকডাউনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই স্থান ধ্বংস করে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, অভিযানের উদ্দেশ্য তল্লাশি, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র জব্দ করে সন্ত্রাসবাদ ব্যর্থ করা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, হামাসের অবকাঠামো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ফিরতে দেওয়া হবে না। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট সেনাবাহিনীর বরাতে জানিয়েছে, অস্ত্র অনুসন্ধানে সাফল্য সীমিত এবং বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে রাখা আইনি জটিলতার মুখে রয়েছে।
পৌরসভা জানিয়েছে, উচ্ছেদের লক্ষ্যবস্তু এলাকাটি শূন্য দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার—৪৯টি ফুটবল মাঠের সমান—যেখানে ৫০০টির বেশি পরিবারের অন্তত ২ হাজার ৫০০ মানুষ বসবাস করেন। অবস্থান শনাক্ত করা পরিবারগুলোর মধ্যে ২৮৩টি আত্মীয়দের কাছে এবং ২৬৬টি পৌরসভার শ্রেণিবিন্যাসে অনিরাপদ বলে চিহ্নিত স্থানে রয়েছে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ বাস্তুচ্যুত পরিবার কাছাকাছি ইসা এলাকাসহ প্রতিবেশী এলাকায় আত্মীয় বা আশ্রয়দাতা পরিবারের কাছে গেছে; কেউ সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি এবং মাত্র ২৩টি পরিবার ভাড়া বাড়ি পেতে পেরেছে।
শহরটিকে ঘিরে ফেলা হয়েছে কেন্দ্র থেকে ২ দশমিক ৪ থেকে ৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১০টি প্রবেশপথ বন্ধ করে। উত্তর দিকে রয়েছে হালহুল, নবী ইউনুস ও রাস আল-জোরা; উত্তর-পূর্বে বেইত এইনুন; উত্তর-পশ্চিমে বির আল-মাহজার। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথগুলো হলো জাবাল জুহার, আল-ফাহস, কালকাস, আল-হারায়িক ও দুরা।
শহরের পশ্চিম প্রবেশপথ ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় অভিযানের প্রথম দুই দিন—২৩ ও ২৪ অক্টোবর—ইসরায়েলি বাহিনী তিন অ্যাপার্টমেন্টের একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস করেছে, একটি সিরামিক প্রতিষ্ঠান ও গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান লক্ষ্য করেছে এবং প্রায় ৭ হাজার বর্গমিটার জমি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ২৩ অক্টোবর শুক্রবার মধ্যরাতের দিকে আল-জালদা ও এইন দেইর বাহহা এলাকা থেকেও বাসিন্দাদের লাউডস্পিকারে নির্দেশ দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির হিসাবে, অভিযানের প্রথম ছয় দিনে পুরো গভর্নরেটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ১১০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। আটকদের মধ্যে সাতজন শিশু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও কয়েক ডজন সাবেক বন্দি রয়েছেন; তিন নারীকে গ্রেপ্তার করে দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও তৃতীয়জনকে আল-মাসকোবিয়েহ আটক কেন্দ্রে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী শহরের ৫০০টির বেশি স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে।
হেবরন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাবে, এই অবরোধে প্রতিদিনের বাণিজ্যিক ক্ষতি ১ কোটি ২০ লাখ শেকেল—প্রায় ৩৮ লাখ ডলার। চেম্বারের সহসভাপতি আদনান আল-নাৎশেহর হিসাবে কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। গভর্নরেটে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং ফিলিস্তিনি বাজারের ৭০ শতাংশ স্বর্ণের কারখানাও এখানে। বাণিজ্যিক ট্রাক চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং শুধু ফারশ আল-হাওয়ার ধ্বংসযজ্ঞেই ক্ষতি হয়েছে ২০ লাখ শেকেলের বেশি—প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার।



