কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে চার দিন ধরে জ্বলছে নলকূপের গ্যাসের আগুন, বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের আশঙ্কায় ২০০ মিটারে ১৪৪ ধারা

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ বসানোর সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে সৃষ্ট আগুন চার দিন ধরে জ্বলছে। আগুনের তীব্রতা না কমায় বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জননিরাপত্তায় ঘটনাস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলার পাশাপাশি লাল পতাকা টানানো হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে এলজিইডির একটি সড়কও।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোটখাল এলাকায় আবদুল্লাহর বাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় হঠাৎ মাটির নিচ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাতে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে অব্যাহতভাবে জ্বলছে আগুন।
শুক্রবার বিকালেও আগুনের তীব্রতা কমেনি। বরং আশপাশে গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও গ্যাসের প্রকৃতি নির্ণয়ে ঢাকা থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে। দলটি মাটি, বালু ও পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে। নুড়ি পাথরসহ আরও কিছু নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আগুনের উৎসস্থল থেকে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির কাজ চলছে। বিপৎসীমা চিহ্নিত করতে টানানো হয়েছে লাল পতাকা। পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এলাকাটি ঘিরে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ঝুঁকি এড়াতে সাধারণ মানুষের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এলজিইডির সড়কটি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে বিকল্প পথে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এসব ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামশুল আলম বলেন, তিন দিন পেরিয়ে গেলেও আগুনের তীব্রতা কমেনি। বাতাসের কারণে আগুনের তাপ ও গ্যাস দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ওই দিকে জনবসতি বেশি হওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। মাঝেমধ্যে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যাচ্ছে। আশপাশের কয়েকটি স্থানে মাটি ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, টানা আগুন জ্বলতে থাকায় সেখানে বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাপেক্সের পরামর্শ অনুযায়ী ২০০ মিটারের মধ্যে থাকা মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত তিন দিন ধরে ফায়ার সার্ভিসের দুটি দল ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল কক্সবাজারে অবস্থান করবে।
বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, সাধারণত মাটির অগভীর স্তরে বায়োজেনিক গ্যাসের ছোট ছোট মজুত বা পকেট থাকে। বাপেক্স সাধারণত ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার গভীরতা থেকে গ্যাস উত্তোলন করে। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতা থেকেই গ্যাস বের হচ্ছে, যা ব্যতিক্রমী ঘটনা। ওই এলাকায় জোনভিত্তিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ থাকলেও এত গভীরতায় আগে অনুসন্ধান করা হয়নি। নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর গ্যাসের প্রকৃতি ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, নলকূপ থেকে গ্যাস নির্গমনের স্থান ও আশপাশে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ বা ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও আগন্তুকদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত গ্যাস নির্গমনের উৎস শনাক্ত করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বাপেক্সের পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।




