রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু, দুপুরে সম্পন্ন দ্বিতীয় দফা পারমাণবিক বিক্রিয়া

পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে প্রথম ইউনিটে দ্বিতীয় দফা পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করে তা সম্পন্ন হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রয়োজনীয় ও সব ধরনের ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর স্টেজ-সি বা পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন পায় প্রথম ইউনিট। এ অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আইএইএর গাইডলাইন অনুযায়ী ও রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের স্টেজ বি-ওয়ান মোটামুটি সফলভাবে শেষ হয়েছে। সবশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ পরীক্ষার জটিলতাও কেটে গেছে।
এর পরের ধাপ বি-টু। এই ধাপে প্রাথমিক অপারেশনের জন্য পারমাণবিক চুল্লিকে প্রস্তুত করা হয়। এরপরই শুরু হয় ক্রিটিক্যালিটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্রিটিক্যালিটি এমন একটি পর্যায়, যেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে চুল্লিতে ধীরে ধীরে স্থায়ী ও নিরাপদভাবে শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। ধাপে ধাপে সফলভাবে এগিয়ে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত এলে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
এর আগে প্রথম ইউনিটের বি-টু ধাপের সব ভৌত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর পরীক্ষার ফলাফল ও অগ্রগতি নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বায়েরার কাছে জমা দেওয়া হয়। সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ৮ অক্টোবর প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি দেন বায়েরা চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান।
বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পাওয়ার পর ১১ অক্টোবর বিকেল থেকে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়। এই অনুমোদন ছিল রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে যাওয়ার জন্য বড় অগ্রগতি।
রূপপুরের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন একটি উৎস যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সক্ষমতার নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রথম ইউনিটের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও পুরোদমে চলছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম আনা শুরু হয়েছে। দুই ইউনিটের বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলে লোডশেডিং কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়েছে। তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুতের দামও কম পড়বে বলে ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম। ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে রোসাটমের প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। ঋণ হিসেবে রাশিয়া দেবে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা, বাকি ব্যয় হবে বাংলাদেশ সরকারের। প্রকল্প ব্যয়ের ৯০ শতাংশ সরবরাহ ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রোসাটম এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু করেছে রাশিয়া। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি রূপপুরে এসে পৌঁছবে। আগামী বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে।




