মাধ্যমিকে পাঠ্যবই ছাপায় গতি কম, পিডিআই শেষ মাত্র ৩৭ শতাংশ বইয়ের — পিছিয়ে নবম-দশম শ্রেণি

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবই ছাপা, মান যাচাই ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ নিয়ে চাপে রয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক স্তরে অগ্রগতি তুলনামূলক কম। বিশেষ করে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজে পিছিয়ে রয়েছে কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান।
এনসিটিবির গত ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তর মিলিয়ে ৯২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলিয়ে মুদ্রণ শেষ হয়েছে ৫৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বইয়ের। তবে ছাপা শেষ হওয়া আর মান যাচাই করে সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয় — মাধ্যমিক স্তরে প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শন বা পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বইয়ের।
সরকারের লক্ষ্য, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব মানসম্মত বই উপজেলা পর্যায়ের বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া। প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর জন্য বই ছাপা ও সরবরাহের এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
স্তরভিত্তিক হিসাবে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি — মুদ্রণ শেষ হয়েছে ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ বইয়ের। এই স্তরে পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ বইয়ের।
প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি, মুদ্রণ অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ স্তরে পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৭৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ বইয়ের। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকুর দাবি, প্রাথমিকের বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই উপজেলা পর্যায়ে শতভাগ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না।
ইবতেদায়ি স্তরে মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি। এ স্তরে মুদ্রণ অগ্রগতি ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং পিডিআই সম্পন্ন হয়েছে ৫১ দশমিক ১১ শতাংশ বইয়ের।
মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বই ছাপার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বই ছাপা হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় অর্ধেক বইয়ের মুদ্রণ এখনও বাকি, আর ছাপা হওয়া বইয়ের বড় একটি অংশের মান যাচাইও শেষ করতে হবে।
এনসিটিবির চুক্তি অনুযায়ী, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই ৩ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু গত ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত কয়েকটি লটে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল না বলে সংস্থাটির মনিটরিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ৫০ শতাংশ দিয়ে দেবে; তা না হলে জরিমানা দিতে হবে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবাই ৫০ শতাংশ বই সরবরাহ করবে বলে আশা করা যায়।
মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে অনিন্দ্য প্রিন্টিং প্রেস, আলিফ প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং, অনুপম প্রিন্টার্স লিমিটেড, অ্যারিস্টোক্রেটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, আমিন আর্ট প্রেস, দোয়েল প্রিন্টার্স ও বর্ণমালা প্রেস।
এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানান, কাজের ধীরগতির কারণে ৩২টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি বাতিল করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ শেষ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি লটে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করায় অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপার কাজে গতি কমেছে।
বইয়ের মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি তদারকি দল কাজ করছে। মানদণ্ড পূরণ না করায় ৩৬টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে ৯ লাখ নিম্নমানের ছাপা ফর্মা এবং প্রায় ১২ হাজার বই বাতিল করা হয়েছে। এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; বই গ্রহণের পর মানের ঘাটতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে এনসিটিবি।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপা ও সরবরাহের কাজ চলছে।’ তাঁর আশা, অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশে পৌঁছাবে এবং ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের ৯৫ শতাংশের বেশি বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে; তবু চেষ্টা থাকবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া।




