মাগুরায় যুবদল নেতা হত্যা ও দেড় শ ভরি সোনা ডাকাতি: স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কসহ গ্রেপ্তার চার, জব্দ পাঁচ সোনার বার

মাগুরায় যুবদল নেতা শাকের হোসেন হত্যা এবং দেড় শ ভরি সোনা ডাকাতির মামলায় পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুই ঘটনায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত মোট চারজন গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার মারুফ হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ডাকাতির পাঁচটি সোনার বার জব্দ করা হয়েছে। তবে সোনা ডাকাতি ও যুবদল নেতা হত্যার ঘটনা পরস্পর সম্পর্কিত কি না, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি পুলিশ।
গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা শাকের হোসেন। তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর। ওই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও অস্ত্র মামলা করেন।
হত্যা মামলায় আজ শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পরদিন রাতে গ্রেপ্তার করা হয় রনি শিকদার ও শামীমা তাবাসসুমকে। রনির বয়স ৩৮ বছর, শামীমার ৩১ বছর। রনি শিকদার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তাঁরা দুজন এখন পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
গত মঙ্গলবার সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় ঝিনাইদহের অনিমেষ মজুমদার নামের এক সোনা ব্যবসায়ীকে। তাঁর বয়স ৫৫ বছর। তিনি ঝিনাইদহের গীতাঞ্জলি সড়কের গিনি হাউস নামে একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হলো মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মারুফ হোসেনকে।
হত্যা মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেলে আসামি মারুফ হোসেনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
সোনা ডাকাতির ঘটনায় মামলা করেছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার মো. মজিবর রহমান। তিনি একজন সোনা ব্যবসায়ী। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মাগুরা সদর থানাধীন রামনগর বাজার এলাকায় সোনা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনার দিন তিনি ঢাকার তাঁতীবাজারের পীযূষ নামের এক সোনা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫০ ভরি সোনা সংগ্রহ করে ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাসে ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে রওনা হন। অনিমেষ মজুমদার বর্তমানে যুবদল নেতা হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন।
বাসটি মাগুরার রামনগর বাজারে পৌঁছালে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি দল নিজেদের পুলিশ পরিচয়ে বাস থামিয়ে মজিবর রহমানকে জোর করে নামিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় বলে মামলায় বলা হয়েছে। ডাকাতেরা তাঁর কাছে থাকা সোনা বের করে দিতে বললে তিনি অস্বীকৃতি জানান। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা তাঁকে লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাতের চেষ্টা করে। তিনি মাথা সরিয়ে নিলে আঘাত তাঁর ডান কাঁধে লাগে এবং হাড় ভেঙে তিনি গুরুতর আহত হন।
এরপর ডাকাতেরা তাঁকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মেরে তাঁর প্যান্টের বেল্টের নিচে তৈরি পকেট থেকে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের ১৫০ ভরি তেজাবি সোনার দণ্ড এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় মজিবর রহমানের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে ডাকাত দল ভয়ভীতি দেখিয়ে মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়।
মজিবর রহমান মুঠোফোনে বলেন, ঘটনার পর তিনি নিকটস্থ নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে যান, যা শ্রীপুরে অবস্থিত। সেখান থেকে জানানো হয়, এটি মাগুরা সদর থানার মধ্যে পড়েছে। এরপর মাগুরা সদর হাসপাতালে গিয়ে তিনি চিকিৎসা নেন। সেখানে তাঁর আপনজন কেউ না থাকায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তিনি চলে আসেন। পরে ১৫ অক্টোবর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসেন তিনি।
মাগুরা সদর থানার নথি অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাতে মাগুরা সদর থানায় পেনাল কোডের ১৭০, ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারায় ডাকাতির মামলাটি করা হয়েছে। এ বিষয়ে মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক আহম্মেদ বলেন, তিনি থানায় ওসি হিসেবে নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই আগের অভিযোগের বিষয়ে নথিপত্র না দেখে কিছু বলতে পারবেন না।
ডাকাতির মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মোহাম্মাদ আশরাফুজ্জামান। তিনি বলেন, এই মামলায় শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ার বাসিন্দা মো. জুয়েল হোসেন, তৌকির আহমেদ, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফ হোসেন ও তাঁর স্বজন ফরিদ মণ্ডল। জুয়েল হোসেন ও তৌকির আহমেদকে বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁরা কারাগারে রয়েছেন। তাঁরা দুজনই নিহত যুবদল নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া ফরিদ মণ্ডল গ্রেপ্তার মারুফ হোসেনের শ্বশুর।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন শুক্রবার বিকেলে বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করছেন না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে। গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনার পাঁচটি টুকরা জব্দ করা হয়েছে। সেগুলো পরিমাপ করা হচ্ছে, আদালতে উপস্থাপন করা হবে। ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে পুলিশের তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।



