তিন বছর ধরে চলা কাতারবিরোধী প্রভাব অভিযান: ৫৩ কোটি বার দেখা হয়েছে বর্ণবাদী ও মুসলিমবিরোধী বিজ্ঞাপন, বলছে গবেষণা
বর্ণবাদী, ইসলামভীতিমূলক ও কাতারবিরোধী মত প্রচারকারী বহু বছর ধরে চলা একটি অর্থায়িত প্রভাব অভিযান উদ্ঘাটন করেছেন দুই শিক্ষাবিদ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তাঁদের তিন বছর ধরে করা তদন্ত অনুযায়ী, প্রমাণ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযানটি ইসরায়েলি স্বার্থে পরিচালিত হয়েছিল।
গবেষণা প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘ম্যানুফ্যাকচারিং দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’। এতে বলা হয়েছে, অভিযানটির ব্যয় সম্ভবত ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি এবং এটি ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননসহ ৩০টি দেশে পরিচালিত হয়েছে। ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে কয়েক মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এর বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শে এসেছেন।
নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দোহা ক্যাম্পাসের অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোন্স এবং স্বতন্ত্র গবেষক সোহান ডিসুজা এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। তাঁরা একে সম্ভবত এযাবৎ নথিভুক্ত সবচেয়ে বড় ডিজিটাল প্রভাব ও ভুয়া তথ্য অভিযানগুলোর একটি বলে অভিহিত করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মুসলিমবিরোধী, অভিবাসীবিরোধী, বর্ণবাদী ও কাতারবিরোধী মত প্রচারকারী সামাজিক মাধ্যমের বিজ্ঞাপন অন্তত ৫৩ কোটি ৩০ লাখ বার প্রদর্শিত হয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলোর কয়েকটি লক্ষ্য দেশে নির্বাচনের আগেও চালু করা হয়েছিল।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, মোট বিজ্ঞাপন স্থাপনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিল ফ্রান্সে, যা লক্ষ্য দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞাপন সবচেয়ে বেশিবার দেখা হয়েছে যুক্তরাজ্যে, ১৫ কোটি ৪০ লাখ বার; দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্র, ১০ কোটি বার। ফরাসি পত্রিকা লে মঁদও ফ্রান্সকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানের বিষয়টি তুলে ধরেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ফ্রান্সে বিজ্ঞাপন কেনা চলেছে ২০২৪ সালের জুনের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগের মাসগুলো জুড়ে, আর যুক্তরাজ্যে কেনা বন্ধ হয়েছে ২০২৪ সালের ১৭ মে, সাধারণ নির্বাচন ঘোষণার কয়েক দিন আগে। গবেষকেরা বলেছেন, মুসলিমবিরোধী ও অভিবাসীবিরোধী বয়ানের ধারাবাহিক প্রচার এসব ভোটের আগে আনুষ্ঠানিক প্রচারকালের বাইরে গিয়েও রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ তোলে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ২০২৭ সালে বড় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে থাকা ফ্রান্স ও ইতালিসহ দেশগুলোতে অভিযানটি এখনো সক্রিয় রয়েছে।
জোন্স বলেন, ইউরোপে বিজ্ঞাপনগুলো ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কাঠামো ব্যবহার করে, যেখানে বলা হয় শ্বেতাঙ্গদের অভিবাসীদের দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ইহুদিবিরোধী সংস্করণে জর্জ সোরোসকে যে গোপন শক্তির ভূমিকা দেওয়া হয়, এই অভিযানে কাতার সেই ভূমিকা পেয়েছে: ইউরোপকে ‘ইসলামিকরণের’ জন্য মুসলিম অভিবাসন পরিচালনাকারী এক লুকানো শক্তি হিসেবে কাতারকে তুলে ধরা হয়েছে।
পৃথকভাবে, টিকটকে প্রকাশিত অভিযানটির একটি অংশ ইউরোপের দর্শকদের কাছে ইরানে সরকার পরিবর্তনের প্রচার করেছে। তদন্তে পাওয়া গেছে, এসব বিজ্ঞাপন প্রথম চলতে শুরু করে ২৪ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর চার দিন আগে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রমাণ থেকে মাঝারি থেকে উচ্চ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, প্রভাব অভিযানটি ইসরায়েলের ভেতর থেকে চালু হয়েছিল। গবেষকেরা জানিয়েছেন, মেটাডেটায় দেখা গেছে অভিযানটির ভিডিও সম্পাদকেরা ইসরায়েলি সময় অঞ্চলে কাজ করেছেন এবং হিব্রু নামের ড্রাইভ ও ফোল্ডারযুক্ত যন্ত্র ব্যবহার করেছেন।
কাতার এর আগেও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট অভিযানের লক্ষ্য হয়েছে। গত মাসে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হওয়া হামলার পরের সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি প্রভাব বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পরামর্শকদের একটি দল দোহাকে লক্ষ্য করে গোপন অভিযানে কাজ করেছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ দল কোনো প্রমাণ ছাড়াই মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ইসরায়েলি নির্বাচনে দোহার হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে; কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ‘ভুয়া তথ্য অভিযান’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।


