কলম্বিয়ায় শান্তি আদালতের বাজেট ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা, যুদ্ধাপরাধের শিকার পরিবারগুলোর উদ্বেগ
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়ার প্রশাসন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার আদালত জেইপির (স্পেশাল জুরিসডিকশন ফর পিস) ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। চলতি মাসে ঘোষিত ২০২৭ সালের বাজেটে জেইপিসহ কয়েকটি সরকারি সংস্থার জন্য নাটকীয় হারে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, জেইপির বাজেট থেকে কাটা হচ্ছে প্রায় ১৮ হাজার ১০০ কোটি কলম্বিয়ান পেসো, যা প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সমান।
জেইপি গঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে কলম্বিয়া সরকার ও দেশটির সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠী ফার্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে। ছয় দশক ধরে চলা অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের সময় সংঘটিত অপরাধের তদন্ত ও বিচারের দায়িত্ব এই আদালতের ওপর। এই সংঘাতে নিহত হয়েছেন চার লাখ ৫০ হাজার ৬৬৪ জনের বেশি মানুষ, আর নিখোঁজ রয়েছেন এক লাখের বেশি মানুষ, যাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আজও জানা যায়নি।
বাজেট ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি বুধবার সিনেটের একটি কমিটি জেইপিকে ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে পুরোপুরি বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম সাধারণ আদালত ব্যবস্থায় হস্তান্তরের একটি বিলও এগিয়ে নিয়েছে। ফলে শুধু বরাদ্দ কমানো নয়, আদালতটির অস্তিত্ব নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো বলছে, এই আদালতই তাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, যা সাধারণ বিচারব্যবস্থা কখনো দিতে পারেনি। অ্যাঞ্জেলা কর্দোন কিশোরী বয়সে তার বাবা ও চাচাকে হারান। তার চাচা রেইনালদো কর্দোন হেরেরা ছিলেন মুদি ব্যবসায়ী; ২০০৩ সালের ২২ জানুয়ারি ট্রাকে করে যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। পরের মাসে তার বাবা গিয়ের্মো কর্দোন হেরেরা ভাইয়ের খোঁজে বের হন। এক রাতে তিনি বাড়িতে ফোন করে জানান, ভাইকে অপহরণের জন্য দায়ী বলে মনে করা বিদ্রোহীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। সেটাই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা; বাবা-চাচা কারও মরদেহই আর পাওয়া যায়নি।
অ্যাঞ্জেলা বলেন, তিনি তার জীবনটাই এই খোঁজে উৎসর্গ করেছেন, এবং জেইপির মাধ্যমেই তিনি বাবা ও চাচার বন্দিদশার সময় এবং তাদের হত্যা করা স্থান সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। সাবেক ফার্ক সদস্যদের সঙ্গে মিলে তাদের দেহাবশেষ খুঁজে বের করার চেষ্টাও চালিয়েছে জেইপি। তার আশঙ্কা, বরাদ্দ কমলে মাঠপর্যায়ে উত্তর খোঁজার অভিযান কমে যাবে, মানবিক কর্মীও কমবে। তিনি বলেন, ‘এর মানে সম্ভবত আমরা আর কখনোই সেই স্থানে ফিরে যেতে পারব না।’
প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েয়া অবশ্য বাজেট ছাঁটাইকে যুক্তিসঙ্গত বলেছেন কলম্বিয়ার বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের প্রসঙ্গ টেনে; দেশটির ঋণ এখন ৩৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি। সেপ্টেম্বরে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ব্যয় পরিচালনা করা, ফলাফল দাবি করা এবং সবার জন্য কাজ করে এমন বিচারব্যবস্থায় সরকারের সীমিত সম্পদ বরাদ্দ করা আমার দায়িত্ব।’ তার হিসাব, ২০২৬ সালে জেইপির শুধু বেতন বাজেটই ছিল ৪০ হাজার ৪০০ কোটি পেসোর বেশি, প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কৃচ্ছ্রসাধনই কি আসল উদ্দেশ্য। দে লা এসপ্রিয়েয়ার ২০২৭ সালের বাজেটের মোট আকার প্রায় ৬৩৪ লাখ কোটি পেসো, প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার — যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যয় প্যাকেজ এবং সামগ্রিকভাবে ব্যয় বাড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেইপিকে ধীরগতির ও অকার্যকর বলেও বারবার সমালোচনা করেছেন; তার অভিযোগ, আদালতটি প্রতিশ্রুত ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এর তদন্ত সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট এবং বিদ্রোহীদের প্রতি নরম। রেডিও অনুষ্ঠান রিক্যাপ ব্লুতে তিনি জেইপির বিরুদ্ধে ‘দেশের নায়কদের হয়রানি’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ করা গেরিলাদের হাত ধুয়ে দেওয়ার’ অভিযোগ তোলেন।
ভুক্তভোগীদের পক্ষের আইনজীবী আনা মারিয়া রদ্রিগেজ পক্ষপাতের এই অভিযোগকে ‘স্পষ্টতই মিথ্যা’ বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, জেইপি ফার্কের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজনকে দণ্ড দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি নিখুঁত বা সম্পূর্ণ হয়নি, তবে এখানকার শান্তি প্রক্রিয়া বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কাছে অধ্যয়ন করা একটি মডেলে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি কার্যকর রাখতে হবে।’ তার মতে, বাজেট কাটলে দণ্ড আরও কমবে এবং দায়মুক্তিই বাড়বে, কারণ অনেক অপরাধীই জেইপির বাইরে কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হননি।
মামলাগুলো এগিয়ে নিতে জেইপি সৈনিক, বিদ্রোহী ও অন্যান্য যোদ্ধাদের সহযোগিতার বিনিময়ে লঘু দণ্ডের সুযোগ দিয়েছে; এসব ক্ষেত্রে সাধারণত কারাদণ্ডের বদলে পুনর্বাসনমূলক কাজ ও সমাজসেবার সাজা হয়। এই ধরনের সাজাই সমালোচনার অংশটি তৈরি করেছে। রদ্রিগেজের মতে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে একটি সমাপ্তি দেওয়ার জন্য এমন সমঝোতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সাক্ষী সহযোগিতা কর্মসূচি ছাড়া মামলাগুলো কীভাবে এগোবে তা স্পষ্ট নয়, এবং জেইপির তহবিল কমানো হবে ভুক্তভোগীদের জন্য ‘একেবারেই বিপর্যয়কর’।
বাজেট ছাঁটাই প্রত্যাশিত হওয়ার আগেই কলম্বিয়ার কংগ্রেসের ২০ জনের বেশি সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে সাহায্য চেয়ে একটি খোলা চিঠিতে সই করেছেন। আইসিসির দায়িত্বও জেইপির মতোই যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও বিচার, এবং আন্তর্জাতিক আদালতটি জেইপি সৃষ্টিকারী ২০১৬ সালের শান্তিচুক্তির সমর্থক ছিল। আইনপ্রণেতারা চিঠিতে লিখেছেন, বাজেট অনুমোদিত হলে এই আদালতের আওতাধীন অপরাধগুলোর তদন্ত, বিচার এবং সাজা কার্যকর করা ঝুঁকিতে পড়বে বলে তারা উদ্বিগ্ন।



