পম্পেইয়ের সিল করা আলমারিতে মিলল সুগন্ধির শিশি, শিশুর গলার হার আর ৩৮টি ব্রোঞ্জ মুদ্রা

ইতালির প্রাচীন শহর পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষে একটি কাঠের আলমারি খুলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা পেয়েছেন সুগন্ধির শিশি, মেকআপের সরঞ্জাম, মুদ্রা আর একটি শিশুর গলার হার। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বন্ধ থাকা এই আলমারিটি ছিল শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক ভিয়া দেল'আব্বনদানজার একটি বাড়ির একটি কক্ষে।
খ্রিস্টাব্দ ৭৯ সালে মাউন্ট ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই ধ্বংস হয়ে যায়। সেই বিপর্যয়ের আগে শহরবাসীর দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল, এই আলমারির জিনিসপত্র সেই জীবনের ঘনিষ্ঠ একটি ছবি তুলে ধরেছে বলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা জানিয়েছেন।
আলমারির ভেতরে পাওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে রয়েছে চিমটা, একটি ছোট কাচের সুগন্ধির শিশি, একটি ধূপদানি আর একটি ব্রোঞ্জের বাতি। প্রতিটি জিনিসই ছিল বাড়ির বাসিন্দাদের নিত্যব্যবহারের সামগ্রী।
তবে গবেষকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তুটি হলো একটি হার, যাতে বিভিন্ন উপাদানে তৈরি ২০টির বেশি ছোট ছোট তাবিজ ঝুলছে। এসব তাবিজে বেস ও মার্কারিসহ কয়েকজন দেবতার প্রতিকৃতি রয়েছে।
এই ধরনের হারকে বলা হয় ‘ক্রেপুন্ডিয়া’। ঐতিহ্যগতভাবে শিশুরা এই হার পরত। তাবিজগুলো নড়াচড়ায় শব্দ করত, ফলে বাবা-মা সহজে বুঝতে পারতেন শিশুটি কোথায় আছে; একই সঙ্গে এগুলো শিশুকে শনাক্ত করতেও সাহায্য করত।
পম্পেই প্রত্নতাত্ত্বিক পার্কের পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুখট্রিগেল বলেন, ক্রেপুন্ডিয়ার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল বাবা-মায়ের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার একটি স্মারক, যাঁরা হয়তো দূরে কোথাও থাকতেন; সেই সমাজে এটি ছিল খুবই প্রচলিত, যেখানে মানুষ প্রায়ই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতেন। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অনেক মানুষ ঘুরে বেড়াতেন এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সঙ্গে বয়ে বেড়াতেন বলেও তিনি জানান।
আলমারিটিতে আরও ছিল ৩৮টি ব্রোঞ্জ মুদ্রা, রান্নার পাত্র আর সিসার ওজনসহ একটি কাঠের বাক্স। এসব দেখে গবেষকদের ধারণা, ওই বাড়িতে একজন ব্যবসায়ী বা কারবারি বসবাস করতেন।
টাকা-পয়সা আর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনাটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে বাড়ির বাসিন্দাদের অগ্ন্যুৎপাতের সময় খুব কম সময়ের নোটিশে পালিয়ে যেতে হয়েছিল—জুখট্রিগেল এমনটাই বলেছেন।
বাড়িটির ভাণ্ডার এলাকায় রাখা একটি মাটির পাত্রের (অ্যাম্ফোরা) ভেতরে দুটি ইঁদুরের খণ্ডিত কঙ্কালও পাওয়া গেছে।
বাড়িটি অতীতে কর্নেলিয়াস ম্যাক্সিমাস নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হতো, কারণ সেখানে শিলালিপি পাওয়া গিয়েছিল; সেসব শিলালিপি এখন আর দৃশ্যমান নয়। বাড়িটির সম্মুখভাগ প্রথম খনন করা হয়েছিল ১৯১২ সালে, তবে একটি বৃহত্তর পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এখন এর কয়েকটি কক্ষে নতুন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন।
পম্পেইয়ের উপকণ্ঠে ‘ভিলা অব দ্য মিস্ট্রিজ’ এলাকাতেও খনন চলছে, যা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রথম আলোতে আসে। জুখট্রিগেল বলেন, জায়গাটি কখনোই পুরোপুরি খনন করা হয়নি, তাঁরা সেই কাজটাই শেষ করতে চান। এবারের খনন মালিকদের বসবাসের অংশে নয়, বরং দাস-দাসীদের থাকার অংশে চলছে; গবেষকদের আশা, সেখান থেকে ইতিহাসের ছায়ায় থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতি সম্পর্কে আরও ধারণা মিলবে।
পম্পেইয়ের ধ্বংসাবশেষে নিয়মিতই নতুন আবিষ্কার সামনে আসে। ২০২৫ সালে শহরের ধনী এলাকা রেজিও নাইনের ভিয়া দি নোলায় একটি বাড়ি খননে পাওয়া গিয়েছিল বড় ও সুসজ্জিত একটি তাপীয় স্নানাগার কমপ্লেক্স, যেটি বাড়ির মালিক ধনী অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়।



