এডেনে হুথি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে ‘প্ল্যান বি’ গোছাচ্ছেন বাসিন্দারা: খাবার মজুত, পালানোর পথ ঠিক করা
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনে গত এক মাস ধরে বারবার শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটছে। বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল মালিকের কাছে এই বিস্ফোরণগুলো সামনে আরও অন্ধকার দিনের অশনি সংকেত।
ইয়েমেনের হুথিরা এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সামরিক ক্যাম্প, শহরের বন্দর এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদসহ কয়েকটি স্থানে হামলার দাবি করেছে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদটি ইয়েমেন সরকারের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
শহরটি আবার ব্যাপক সহিংসতায় ডুবে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় আবদুল মালিক সতর্কতা নিতে শুরু করেছেন। তিনি খাবার মজুত করেছেন এবং লম্বা যাত্রার জন্য নিজের গাড়ি প্রস্তুত রেখেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে মজুত করতে শুরু করেছি।’ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়লে তাঁর ‘প্ল্যান বি’ হলো পরিবার নিয়ে এডেন ছেড়ে উত্তর-পূর্বের শাবওয়া অথবা পূর্বের হাদরামাউতে আশ্রয় নেওয়া।
তিনি বলেন, ‘আমরা শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি পথ ঠিক করে রেখেছি। গাড়ি পরীক্ষা করে রেখেছি, জরুরি জ্বালানিও আলাদা করে রেখেছি। যেকোনো মুহূর্তে পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য আমি প্রস্তুত।’
চার বছরের আপেক্ষিক শান্তির পর গত কয়েক মাসে ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার জ্বলে উঠেছে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে—যখন হুথিরা দেশের পশ্চিমে সরকারপন্থি ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) নিয়ন্ত্রিত এলাকা দখলে বড় অভিযান শুরু করে।
এক সপ্তাহের মধ্যে ইরান-সমর্থিত এই সশস্ত্র গোষ্ঠী হোদেইদা ও তাইজ প্রদেশের কয়েকটি জেলা দখল করে, যার মধ্যে রয়েছে এনআরএফের শক্ত ঘাঁটি বন্দর শহর মোখা এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি।
অক্টোবরের শুরুতে সরকারি পাল্টা অভিযানে লোহিত সাগর উপকূলে সীমিত অগ্রগতি হয়েছে। তবে একই সময়ে হুথিরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজের অবরোধ আরও কঠোর করেছে—শহরটিকে এডেনের সঙ্গে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখলের পর।
অন্য জায়গায় তীব্র লড়াই চললেও এডেন তুলনামূলক শান্ত ছিল এবং সংঘাতে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। এই মাসে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঢেউ সেই শান্তি ভেঙে দিয়েছে এবং হুথিরা এডেন দখলের চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
তাইজ থেকে পালিয়ে আসা বন্ধুদের কাছে শোনা বিবরণ তাঁর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে; সেখানে লড়াই ও অবরোধে দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। আবদুল মালিক বলেন, ‘তাইজে দাম ইতিমধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেছে, এডেনেও সহজেই একই ঘটনা ঘটতে পারে। এডেন বন্দরে হামলা হলে দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর্মস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করি—কী কেনা উচিত, কোন খাবার মজুত করা উচিত, আমাদের বিকল্প পরিকল্পনা কী এবং যেতে হলে কোথায় যাব।’ হুথি হামলায় এডেনের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়েছে; কিছু পরিবার বিশেষ করে রাতে চলাচল সীমিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের সময় আমার এক সহকর্মী ছেলেকে স্কুলে আনতে গিয়ে দেখেন, শিক্ষার্থীরা ভয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে আছে। আমরা কাজে যাই, বাচ্চাদের স্কুলে নিই, কিন্তু একটা উদ্বেগ ও উত্তেজনা কাজ করে।’
ইয়েমেনের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে। হামলায় বারবার বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে; এয়ারলাইনগুলো ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্ব করতে এবং অন্য ফ্লাইট ইয়েমেনের অন্য বিমানবন্দর বা বিদেশে ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
বিমানবন্দরের কাছের বাসিন্দাদের জন্য বারবার হামলা ও বিস্ফোরণ পরিবারগুলোর ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছে। বিমানবন্দরের কাছে খোর মাকসার জেলার বাসিন্দা আহমেদ আওয়াধ বলেন, হামলায় শিশুরা ভয় ও উদ্বেগে ভুগছে। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণে শিশুরা আতঙ্কে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, সারা রাত আর ঘুমাতে পারে না। এখন সাধারণ বিমানের শব্দেও আমার পরিবার ভয় পায়।’
আওয়াধ জানান, হামলায় স্কুল ও ব্যবসা ব্যাহত হয়েছে; পরিবারগুলো তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরছে এবং কিছু বাবা-মা সন্তানদের স্কুল থেকে দূরে রাখছেন। কিছু পরিবার শিশু ও বয়স্কসহ ঝুঁকিতে থাকা স্বজনদের প্রতিবেশী লাহজ ও আবিয়ান প্রদেশে বা এডেনের অন্য জেলায় পাঠিয়ে দিয়েছে। অন্যরা বিমানবন্দর থেকে দূরে বাড়ি ভাড়া নিয়েছে।
১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকা আওয়াধ বলেন, হামলার সময় শিশুদের জানালা থেকে দূরে রাখার মতো সতর্কতা নিয়েছেন তাঁরা। প্রতিটি বিস্ফোরণের পর একে অপরের খোঁজ নিতে তিনি ও প্রতিবেশীরা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, ‘বেসামরিক জনগণের সেবায় থাকা এডেন বিমানবন্দর, অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ও আবাসিক এলাকা লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।’
হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানার পর এডেন ইয়েমেনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর। ২০১৫ সালের শুরুতে হুথিদের সঙ্গে তাদের প্রতিপক্ষের তীব্র লড়াই এবং সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় শহরটি ব্যাপক ধ্বংসের শিকার হয়। হুথিদের তাড়িয়ে দেওয়ার পরও শহরে হুথি-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলেছে, যারা কখনো কখনো একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছে।
এডেন ও হাদরামাউত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার অধ্যাপক আদিব আল-শাত্রি বলেন, হুথি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সর্বশেষ ঢেউ আইনশৃঙ্খলাহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শহরের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার কেন তার অস্থায়ী রাজধানী ও সরকারের আসন এডেনকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকানোর পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ছাড়া হুথি হামলার মুখে ঝুঁকিতে রেখেছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এডেন এখন রাজধানী, এখানে বড় ও ছোট সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই বৈধ সরকারকে অবশ্যই একে রক্ষা করতে হবে।’
ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী এডেনে আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকার দাবি করেছে; বেসামরিক এলাকায় পৌঁছানোর আগেই ড্রোন আটকানোর খবরও পাওয়া গেছে। আকাশ প্রতিরক্ষা অপর্যাপ্ত—এমন সমালোচনার বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-এরিয়ানি সাড়া দেননি।
আল-শাত্রি বলেন, জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার ও নিত্যপণ্য মজুত করার সামর্থ্য এডেনের ধনী বাসিন্দাদের মাত্র একটি ছোট অংশের রয়েছে। বেশির ভাগ বাসিন্দা ইতিমধ্যে পরিবারের খাবার জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণ জীবনযাপনের জন্যই এডেনের মানুষের বর্তমান বেতনের তিন গুণ প্রয়োজন।’
তবে হুথি হামলায় এডেনের ব্যবসা ও শিক্ষা পুরোপুরি থেমে গেছে—এমন ধারণার বিরোধিতা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের মাত্র এক ঘণ্টা পরেই শহরে মানুষের চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়, কারণ উপার্জন ও প্রতিদিনের রুটির ব্যবস্থা করতে তাদের চলতেই হয়। কাজ বন্ধ হলে আর্থিক সংকট দেখা দেবে এবং নিজেদের খাবার জোগাতে পারবে না তারা।’



