সুনামগঞ্জের শাল্লায় যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষীর বাড়ি-দোকানে মধ্যরাতে হামলা ও লুটের অভিযোগ, আহত অন্তত পাঁচ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার প্রত্যন্ত দৌলতপুর গ্রামে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক সাক্ষীর বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে দৌলতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হামলা ও ভাঙচুরের আলামত সংগ্রহ করেছে। ভুক্তভোগীদের মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় মামলা করতে কিছুটা দেরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মধ্যরাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একদল লোক দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়। এ সময় বাড়িঘর ও দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর এবং মালামাল লুট করা হয়।
দুলাল মিয়ার বাবা মামুদ আলী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। পরিবারের দাবি, মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরিবারের সাতজন স্বজন ও আত্মীয় শহীদ হয়েছেন। দুলাল মিয়া ২০১৬ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষী হিসেবে তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দেন। ওই মামলায় তদন্ত সংস্থা ৩২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর প্রায় ১৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দৌলতপুর গ্রামের তোতা টেইলার্স, জলিল মিয়াসহ পাঁচজনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তারা জামিনে মুক্তি পান। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে ৩৪ জনকে হত্যা, পাঁচ নারীকে ধর্ষণ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং ৩০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জ্বলা আক্তার অভিযোগ করেন, তার বাবা ওই মামলার সাক্ষী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
তিনি জানান, বাবা দুলাল মিয়া ও স্বামী হেলাল মিয়া মিলে গ্রামের একটি দোকান পরিচালনা করেন। গত ২৩ অক্টোবর ওই দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি শাল্লা থানাকে জানানোর পর ২৯ অক্টোবর পুলিশ তদন্তে গ্রামে যায়। এ সময় পুলিশ কেন গ্রামে এসেছে, তা নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উজ্জ্বলার দাবি, পুলিশ চলে যাওয়ার পর মধ্যরাতে যুদ্ধাপরাধ মামলার এক আসামির স্বজন জালাল মিয়ার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল তাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়। অভিযুক্তদের মধ্যে তোফাজ্জল মিয়া, শাহিন মিয়া, হেকিম মড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামিম ও নূর ইসলামসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
হামলায় চারটি ফ্রিজ, ছয়টি গরু, দুই ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ চার লাখ টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন উজ্জ্বলা। পাশাপাশি বসতঘর ও দোকানের বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উজ্জ্বলার আরও অভিযোগ, হামলাকারীরা পরিবারের তিন নারী সদস্য ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে মারধর এবং যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করে। এ ছাড়া তাকে ও তার ১২ বছর বয়সী মেয়েকেও যৌন সহিংসতার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। আহতদের পরে দিরাই ও শাল্লা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবার নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় বাড়ির মালামাল লুট করে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তার স্বামী দুলাল মিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
দুলাল মিয়ার জামাতা হেলাল মিয়া জানান, হামলার খবর পেয়ে সুনামগঞ্জ থেকে গ্রামে গিয়ে বাড়ি ও দোকানের মালামাল লুট হওয়া অবস্থায় দেখতে পান। ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোকতাদির আহমদ জানান, দৌলতপুর গ্রামের তিন নারী ও এক শিশু আহত অবস্থায় হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত জালাল মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ওসি মোহাম্মদ সোহেল জানান, বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় পুলিশ ওই গ্রামে তদন্তে গেলে কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।




