গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি না দিলে মেলে না সার, কৃষকদের ক্ষোভ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় সংকট দেখিয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিসিআইসির এক ডিলারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায়; না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকেরা।
গত বৃহস্পতিবার উপজেলার শোভাগঞ্জ বাজারে সার ডিলার পয়েন্ট মেসার্স তমাল চন্দ্র সাহায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পাওয়া যায়। সে সময় সার কিনতে আসা কয়েকজন কৃষককে আশপাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাঁদের কেউ কেউ সকাল থেকেই সার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, সার আনতে গেলে ব্লক সুপারভাইজার (বিএস) ও ডিলারের লোকজন নানা অজুহাত দেখান। এ কারণে প্রায়ই সার ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয় তাঁদের। তবে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায়; তখন আর স্লিপেরও প্রয়োজন হয় না।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, ডিলারের সার মজুত ও বিতরণ রেজিস্টারেও গরমিল পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে।
গংসার হাটের ব্যবসায়ী নয়া মিয়া (৪৫) বলেন, দুপুরের দিকে তিনি সার নিতে এসেছিলেন, আরও আট-দশজন ছিলেন। ভ্যানে ভ্যানে সার যাচ্ছিল। তাঁরা চাইলে শুধু বলা হয়, ‘শেষে নেন’। বিকেলের দিকে বলা হয়, ‘সার আর নাই’। পরে হিসাব করে দেখা যায়, কাগজ-কলমে সার আছে, কিন্তু গুদামে সার নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কৃষক জানান, সরকারি দামে সার কিনতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে; বলা হচ্ছে সার নেই। অথচ কৃষি কর্মকর্তার চোখের সামনেই প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে অনেকে ঠিকই সার নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেখেও না দেখার ভান করছেন।
জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার বিধু রঞ্জন মোবাইল ফোনে বলেন, অতিরিক্ত দামে কোনো সার বিক্রি করা হয়নি। কিছু সারের রসিদ হয়েছে, আবার কিছু সার রসিদ ছাড়াই গুদাম থেকে বের হয়েছে; বিষয়গুলো তাঁরা বুঝতেই পারেননি। এসব নিয়ে কথা বলতেই স্যার (কৃষি কর্মকর্তা) ডেকেছেন, তিনি সেখানেই আছেন — এ কথা বলে তিনি ডিলার পয়েন্টে থাকা চণ্ডী দার কাছ থেকে জেনে নিতে বলে সংযোগ কেটে দেন।
ডিলার পয়েন্ট বন্ধ করে তার পাশেই অবস্থান করছিলেন ম্যানেজারের সহকারী চণ্ডী দাস। বেশি দামে সার বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বুধবার সার বিক্রির দিনে ‘হরিলুট’ হয়েছে; কে কয়টা বস্তা নিয়ে গেছে, কিছুই তাঁরা বুঝতে পারেননি। এখনো অনেকে টাকাপয়সাও দেননি, তাঁরা লোকসানে আছেন। এ কারণে সারের হিসাবটা মেলাতে পারেননি বলেও জানান তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ডিলার তমাল চন্দ্র সাহা মোবাইল ফোনে বলেন, তাঁর ডিলার পয়েন্টে এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মণ্ডল বলেন, ঘটনার সময় তিনি কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে কৃষি কার্ডের কাজে ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে স্যার তাঁকে ফোন দিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। গিয়ে তিনি একটি ভ্যানে ১০টি সারের বস্তা দেখেন। ডিলারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ওখানে দুজন কৃষকের সার। এরপর তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। মজুত ও বিতরণ রেজিস্টারে গরমিল আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, গরমিলের বিষয়টি শুনেছেন, তবে দেখেননি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, বিষয়গুলো তিনি শুনেছেন। বিতরণে কোনো গরমিল আছে কি না তদন্ত করে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছ থেকে মজুত ও বিক্রির স্টক রেজিস্টার বই চেয়েছেন তিনি। সত্যতা পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। সারের মজুত ও বিক্রি রেজিস্টারে গরমিলের বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।




