বরিশাল বিভাগে নিখোঁজ ১,৬৮৯ শিশু-কিশোর, অর্ধেকের বেশি প্রেমের টানে ঘরছাড়া

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬৮৯ জন শিশু কিংবা কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিখোঁজদের অর্ধেকের বেশি ঘর ছেড়েছে প্রেমের টানে। সবচেয়ে বেশি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলায়।
পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলায় ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা ১ হাজার ৬৮৯ জন। পুলিশ এই নিখোঁজের ২১টি কারণ দেখিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭৮ জন ঘর ছেড়েছে প্রেমের টানে। এ ছাড়া ১৬৭ জন পরিবারের সঙ্গে মনোমালিন্য, ১৩২ জন মা-বাবার সঙ্গে অভিমান, ৭৫ জন মাদ্রাসার কঠোর নিয়মনীতি, ১৯ জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপে আসক্তি এবং ১৭ জন পরকীয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধ ও অভাব-অনটনের কারণে ঘর ছাড়ার ঘটনাও রয়েছে।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় চলতি বছরের মার্চে দুই কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হয়; পরিবারের তথ্যমতে, তারা প্রেমের টানে পালিয়ে যায়। গত ২৫ মার্চ বিকেলে খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে আগৈলঝাড়া থানায় অভিযোগ করা হয়। আগৈলঝাড়া থানা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পর কিশোরীকে খুঁজে পাওয়া যায়।
অপরদিকে পরিবারের অমতে প্রেমের টানে বাড়ি ছেড়ে ঘর বেঁধেছিল বরিশালের গৌরনদী উপজেলার এক কিশোরী। তবে স্বামীর বাড়ির নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে বিষপান করে। গত ২২ আগস্ট দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় স্কুলে যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ হয় দাড়িয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির তিন ছাত্রী। পুলিশের তথ্যমতে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওই তিন কিশোরী স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়; স্বজনেরা এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ঢাকার কদমতলী থানাধীন শ্যামপুরের একটি ম্যাচ ফ্যাক্টরি থেকে ১ অক্টোবর তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আদিল হোসেন বলেন, অভাবের কারণে তারা ঘর ছেড়েছিল।
গৌরনদীতে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গত ১ অক্টোবর নিখোঁজ হয়। গৌরনদী মডেল থানার ওসি মো. তারিক হাসান রাসেল জানান, ওই কিশোরকে বরিশাল নগরের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে কাজ করা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
আগৈলঝাড়া, বাকেরগঞ্জ ও গৌরনদীর মতো এ ধরনের নিখোঁজের ঘটনা বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় অহরহ ঘটছে, যা নিয়ে পরিবার ও প্রশাসন উদ্বিগ্ন। জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে হিংস্র প্রবণতা বেড়েছে। তরুণ ও যুবক বয়সের ছেলেমেয়েদের ধারণা, তারা সবকিছু পারে—এ জন্য মব কালচার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিবারিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।’ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নও দরকার বলে মনে করেন তিনি।
বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেন, এ ধরনের নিখোঁজের ঘটনা সম্প্রতি সংসদে আলোচনা হয়েছে। পুলিশ বিভাগও দুশ্চিন্তায় রয়েছে যে এত অল্প বয়সে ছেলেমেয়েরা নিখোঁজ হচ্ছে কেন। তাঁর আশঙ্কা, তাদের মানব পাচার কিংবা অন্য কোনো খারাপ পেশায় জড়ানো হতে পারে।
ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দারের মতে, এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি বড় ফ্যাক্টর; কিশোর-কিশোরীরা লোভে পড়ে বিপাকে পড়তে পারে। উপকূলীয় এলাকা পটুয়াখালী ও ভোলায় এই প্রবণতা বেশি। তিনি জানান, পুলিশ বিভাগ এ ধরনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করছে।




