থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আইনজীবী আরনন নাম্পার মোট সাজা ছাড়াল ৩৪ বছর

থাইল্যান্ডের ব্যাংককের একটি আদালত শুক্রবার মানবাধিকার আইনজীবী আরনন নাম্পাকে রাজদ্রোহমূলক মানহানি আইন, অর্থাৎ ধারা ১১২ লঙ্ঘনের দায়ে দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে। এই আইনে রাজপরিবারের বিরুদ্ধে অনুভূত অবমাননার দায়ে অন্য সব দেশ মিলিয়ে যতজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মানুষকে থাইল্যান্ডে জেলে পাঠানো হয়েছে।
একই অভিযোগে আরননের বিরুদ্ধে আনা ১৪টি মামলার এটি একটি। এই রায়ের পর তাঁর এখন পর্যন্ত পাওয়া মোট সাজা ৩৪ বছরের বেশি দাঁড়িয়েছে। আরও দুটি মামলার রায় এখনো বাকি।
৪২ বছর বয়সী আরনন নাম্পা একজন মানবাধিকার আইনজীবী। ২০২০ সালে মধ্য ব্যাংককে হ্যারি পটার-থিমের এক বিক্ষোভে তরুণ জাদুকর হ্যারি পটারের সাজে তিনি থাইল্যান্ডের শক্তিশালী রাজতন্ত্রকে যাচাই ও জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
রায়ের পর আরনন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কাছে এটি বিস্ময়ের নয়। দেশটি আরও উন্মুক্ত হলে আমরা এসব বিষয়ে অবাধে কথা বলতে পারতাম।’
গত ছয় বছরে থাইল্যান্ডে এই আইনের সবচেয়ে ব্যাপক প্রয়োগ দেখা গেছে, যা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের নজিরবিহীন ছাত্র বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায়, যেখানে প্রথমবারের মতো রাজতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার আহ্বান ওঠে। এখন পর্যন্ত ২৯৪ জনকে এই আইনে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ২০ জন ১৮ বছরের কম বয়সী, এবং সাজা হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০ বছর পর্যন্ত। তাঁদের কয়েক ডজন এখনো বিচারাধীন।
এই আইনে অভিযুক্তদের বেশিরভাগকেই জামিন দেওয়া হয় না এবং মামলা কয়েক বছর চললেও তাঁদের কারাগারেই রাখা হয়। থাই কর্মকর্তারা আইনটির পক্ষে সাধারণত বলেন, এটি ‘থাইল্যান্ডের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে, যেখানে রাজতন্ত্র জাতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়।’
থাই ফৌজদারি বিধির ধারা ১১২-তে বলা হয়েছে, ‘যে কেউ রাজা, রানি, উত্তরাধিকারী বা রাজপ্রতিনিধিকে মানহানি, অবমাননা বা হুমকি দেবে, তার তিন থেকে ১৫ বছর কারাদণ্ড হবে।’
বাস্তবে আইনটির ব্যাখ্যা আরও বিস্তৃত পরিসরে প্রয়োগ করা হয়েছে। রাজপরিবারের যেকোনো সদস্য, রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠান, এমনকি বহু আগে মৃত রাজাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বললেও মামলা হয়েছে, এক ক্ষেত্রে রাজার কুকুর নিয়েও মামলা হয়েছে।
অভিযুক্তদের পক্ষে লড়া সংগঠন থাই লইয়ার্স ফর হিউম্যান রাইটসের সহকারী পরিচালক আকারাচাই চাইমানিকারাকাতে বলেন, আইনের বাক্য কী বলে তা তিনি বলতে পারেন, কিন্তু ‘মানহানি’ বা ‘অবমাননা’ শব্দ আদালত কীভাবে ব্যাখ্যা করে, তার সংজ্ঞা তিনি দিতে পারবেন না, কারণ বিষয়টি এতই অস্পষ্ট। তাঁর ভাষ্যে, আইনটি নিয়ে প্রশ্ন তোলাও ধারা ১১২ অনুযায়ী অপরাধ হতে পারে।
২০২০ সালের প্রেক্ষাপটে, আগের বছর লাখো ভোট পাওয়া সংস্কারপন্থী ফিউচার ফরোয়ার্ড দলকে ফেব্রুয়ারিতে সাংবিধানিক আদালত একটি কারিগরি কারণে বিলুপ্ত করে দেয়। কোভিড মহামারির পর সংক্রমণ কমতে শুরু করলে শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার অবসান দাবিতে সমাবেশ শুরু করেন। আরনন তখন রাজতন্ত্রের অস্বচ্ছ ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে বলে বক্তব্য দেন এবং ক্রাউন প্রপার্টি ব্যুরোর বিশাল সম্পদের ওপর রাজা ভজিরালংকর্নের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট নিয়ে সমালোচনা করেন।
সে সময় এই আইনের প্রয়োগ তিন বছর ধরে স্থগিত ছিল। কিন্তু বিক্ষোভের পর পুনর্মূল্যায়ন হয় এবং ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে ধারা ১১২-তে বিচার আবার শুরু হয়ে গতি পায়। কয়েক ডজন তরুণ কর্মী কারাগার এড়াতে নির্বাসনে পালিয়ে গেছেন।
আরনন গত তিন বছর ধরে ব্যাংকক রিমান্ড কারাগারে আছেন এবং সেখান থেকে তাঁর ছোট মেয়ে ও ছেলেকে চিঠি লিখছেন। তাঁর তিন বছর বয়সী ছেলে কার্লকে কেবল আদালতের শুনানির সময়ই দেখতে পান তিনি; তাঁর ১০ বছর বয়সী মেয়ে প্রান মাঝে মাঝে কারাগারে বাবাকে দেখতে যায় এবং প্রায়ই তাঁর ছবি আঁকে।



