মাত্র তিন ঘণ্টার নোটিশে বান্দরবান ছুট, সাকা হাফং চূড়ায় গায়িকা মাশা

গায়িকা মাশা ইসলাম ঘুরতে ভালোবাসেন। একটু ফুরসত মিললেই তিনি ছুটে যান প্রকৃতির কাছে; তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীমাত্রই তা জানেন। গানের সঙ্গে তাঁর ভ্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে গত আগস্টে প্রচারিত ডিডব্লিউ ট্রাভেলের বাংলাদেশ নিয়ে ভ্লগ, যেখানে জার্মান গণমাধ্যমটির সিরিজ ভ্লগে সহ-সঞ্চালক ছিলেন মাশা।
সেই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পূজার দীর্ঘ ছুটির আগে আবার তাঁর মন ছুটে যেতে চাইছিল। এক কাছের বন্ধু বান্দরবান যাচ্ছিলেন ট্রেকিংয়ে, মাশারও মন বলছিল পাহাড়ের কথা। কিন্তু কারও সঙ্গে তাঁর পরিকল্পনা মিলছিল না। এর মধ্যেই ঘটল এমন কিছু, যাকে কেবল সিনেম্যাটিকই বলা যায়।
সেই কাছের বন্ধু জরুরি কাজে আটকা পড়লেন। তিনি মাশাকে ফোন করে বললেন, মাশা চাইলে বদলি হিসেবে যেতে পারেন। তখন বিকেল পাঁচটা। বান্দরবানের বাস ছাড়বে রাত আটটায়—হাতে মোটে তিন ঘণ্টা। এর মধ্যে সন্ধ্যা ছয়টায় একটা মিটিংও আছে। সব সেরে ‘কী আছে জীবনে’ ভেবে ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে ছুট দিলেন মাশা। একদল অচেনা অভিযাত্রীর সঙ্গে শুরু হলো অন্য রকম এক অভিযাত্রা।
এবার গন্তব্য ছিল দেশের বেসরকারিভাবে সর্বোচ্চ চূড়া সাকা হাফং, সেখানে ছিল মাশাদের চার দিনের অভিযান। মাশা বলছিলেন, ‘আমি যেহেতু সর্বশেষ সদস্য হিসেবে কনফার্ম হই, তাই সিট পড়ে বাসের একেবারে পেছনে। বুঝতেই পারছেন, পুরো রোলার কোস্টার জার্নি। বান্দরবানের আলীকদম পৌঁছাই সকালবেলা। নাশতা করে শুকনা খাবার নিয়ে এরপর আমাদের আসল জার্নি শুরু হয়। সারা দিন ট্রেকিং করে রাতে পৌঁছাই নিকোলাস পাড়া। রাতে থেকে আবার হাঁটা শুরু। তৃতীয় দিন ভোরবেলা আমরা সাকা হাফং উঠি।’ ছুটির মৌসুমে চূড়ায় বেশ ভিড় ছিল। তবে ক্লান্তি ও ভিড়—সব ভুলে পাহাড় থেকে ভোরের সূর্যোদয় অনেক দিন মনে থাকবে মাশার।
তরুণ এই সংগীতশিল্পীর কাছে ট্রেকিং আসলে নিজেকেই চ্যালেঞ্জ করা—প্রতিকূল পরিবেশ, ঠিকঠাক খাবার নেই, পোশাক বদলানোর জায়গা নেই, টয়লেট নেই, পাশাপাশি টানা হাঁটার চাপ। মাশা বলছিলেন, ‘ট্রেকিংয়ের চার দিনের মুহূর্তই ছিল চ্যালেঞ্জিং। কারণ, সব সময়ই মনে হয়, আর বুঝি পারব না। তারপরও চলতে হবে। শেষ পর্যন্ত যখন আপনি চূড়ায় উঠবেন, সেই আনন্দের তুলনা নেই। এ ধরনের অভিযান প্রতিটি মুহূর্তে আপনার মানসিক শক্তির পরীক্ষা নেবে।’
এবারের ট্যুরে মাশা হুট করেই একটা ট্রাভেল গ্রুপের সঙ্গী হয়েছিলেন, কাউকেই আগে থেকে চিনতেন না। এ অভিজ্ঞতাও ছিল দারুণ। তিনি বললেন, ‘গ্রুপে যাঁরা ছিলেন, সবাই খুবই সাপোর্টিভ। চার দিন সুন্দর সময় কেটেছে। ওখানে অনেকেই ছিলেন আমার ভক্ত। সবাই গানের আবদার করতেন। আমি এক কলি গাই, তো অন্যরা আরেকটা। দুই দিন পরে বন্ডিংটা আরও গাঢ় হয়। শুধু আমাদের গ্রুপে নয়, ছুটিতে অনেকেই ঘুরতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে আমার অনেক ভক্ত ছিলেন। অনেকেই আমাকে দেখে অবাক, “আপু, আপনিও এসেছেন!”’
পুরো যাত্রায় আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা। মাশা বললেন, সব সময় নোটিফিকেশনময় জীবন থেকে দূরে থাকা যেমন আনন্দের, তেমনি পরিবারের সদস্যরা চিন্তায়ও থাকেন। শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক ফিরতে পেরেছেন, এতে তিনি খুশি।
প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর গানে প্রভাব ফেলে কি না—এ প্রশ্নে মাশা বললেন, ‘ভ্রমণ কিন্তু শিল্পীদের সমৃদ্ধ করে। কত গল্প যে জানা হয়! এসব গল্প প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ওই গল্প থেকে হয়তো আমরা একটা ভাবনা নিয়ে কিছু একটা তৈরি করতে পারি, তাই না? ভ্রমণ আসলে শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করে।’
ভ্রমণ ও সঞ্চালনার পাশাপাশি গানও চালিয়ে যাচ্ছেন মাশা। দুর্গাপূজায় মুক্তি পাওয়া চিরকুট সিনেমার ‘চলে যেতে যেতে’ গানটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়েছে। সামনে নতুন অ্যালবাম নিয়ে আসছেন তিনি; অ্যালবামের একটি গান ‘শ্রাবণী রোদ’ এরই মধ্যে মুক্তি পেয়েছে, দ্বিতীয়টি ‘ফড়িংয়ের ছল’ও আসবে দ্রুতই। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর পর গানের সঙ্গে অভিনয়টাও চালিয়ে যেতে চান মাশা। তাঁর মতে, এখন যেহেতু নানা ধরনের সিনেমা হচ্ছে, আরেকটু প্রস্তুতি নিলে তিনি দুই মাধ্যমেই কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।
ভ্রমণ নিয়ে আগ্রহের কথা জানিয়ে মাশা বললেন, অনেক দিন ধরেই নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ভ্রমণবিষয়ক ভ্লগ শুরু করার ইচ্ছা তাঁর। তবে কাজের ব্যস্ততার কারণে এখনো সেটা করা হয়ে ওঠেনি।



