প্রেসিডেন্ট থেকে আবার বিদ্রোহী নেতা: কঙ্গোতে নতুন জোটের প্রধান হলেন জোসেফ কাবিলা

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা আবার বিদ্রোহী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ৫৫ বছর বয়সী কাবিলাকে চলতি মাসের শুরুর দিকে ‘ফ্রন্ট ফর দ্য রিফাউন্ডেশন অব দ্য নেশন’ (এফআরএন) নামের নতুন একটি বিদ্রোহী আন্দোলনের নেতা করা হয়েছে।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে অনেক কঙ্গোলিজের দীর্ঘদিনের ধারণাই নিশ্চিত হলো—কাবিলা এম২৩ বিদ্রোহীদের সঙ্গে কাজ করছেন। এম২৩ গত বছর পূর্ব কঙ্গোর বড় অংশ দখল করে নিয়েছিল, যার মধ্যে ওই অঞ্চলের প্রধান দুই শহর গোমা ও বুকাভুও রয়েছে।
কাবিলার রাজনৈতিক জীবনই কঙ্গোর বদলে যাওয়া জোটের রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। ১৯৯৭ সালে তাঁর বাবাকে ক্ষমতায় বসানো বিদ্রোহী জোটের একজন কমান্ডার ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বাবা লরাঁ কাবিলা রহস্যজনকভাবে নিহত হওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্ট হন এবং ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকেন।
ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি যাঁর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন, সেই ফেলিক্স শিসেকেদির সঙ্গেই তিনি জোট সরকার গড়েছিলেন। এখন কাবিলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেই শিসেকেদিকেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত করবেন। অথচ প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, সেই গোষ্ঠীই এখন তাঁর নতুন জোটের অংশ।
কাবিলা এখন অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডের মুখে রয়েছেন। এম২৩-কে সমর্থনের অভিযোগে তাঁর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। নীতি বিশ্লেষক হেনরি-প্যাসিফিক মায়ালা বলেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ফিরে পেতে কাবিলার হাতে আসলে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না।
মায়ালা বলেন, ‘তিনি আসলে অন্য কোনো পছন্দ ছাড়াই রয়ে গিয়েছিলেন।’ তাঁর ধারণা, এম২৩-এর সামরিক শক্তি কঙ্গো সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যৎ যেকোনো আলোচনায় কাবিলাকে বড় দরকষাকষির সুযোগ দিতে পারে এবং বড় ধরনের আশ্বাস না পেয়ে কাবিলা এত বড় ঝুঁকি নিতেন না।
তবে এই জোট তাদের ঘোষিত লক্ষ্য—প্রেসিডেন্ট শিসেকেদিকে ক্ষমতাচ্যুত করা—অর্জন করতে পারবে কি না, তা মোটেও নিশ্চিত নয়। এম২৩-এর দখল করা এলাকা মূলত পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ, যা রাজধানী কিনশাসা থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে। কাবিলার রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক বিদ্রোহকে আরও বিস্তৃত পরিসর দিতে পারে, কিন্তু সারা দেশে সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে কাবিলা শিসেকেদিকে সাবেক শাসক মোবুতু সেসে সেকোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক গবেষণা গোষ্ঠীর কাছে তিনি বলেন, ‘আপনার সামনে একজন স্বৈরশাসক আছেন, যিনি নিজে যা ঠিক মনে করেন তা চাপিয়ে দিতে চান, সংবিধান মানতে চান না—অথচ সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন।’ তিনি সরকারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ব্যবহার করে বেসামরিক নাগরিক, রাজনীতিক ও সামরিক সদস্যদের ভয় দেখানোর অভিযোগও তোলেন।
কাবিলা তাঁর এই মুখোমুখি অবস্থানকে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং সংবিধানের ৬৪ নম্বর ধারার কথা বলেছেন, যেখানে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল বা প্রয়োগের বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে গুঞ্জন রয়েছে, শিসেকেদি তৃতীয় মেয়াদের জন্য সংবিধান বদলের পরিকল্পনা করছেন। তবে ওই একই ধারার নামে গড়া বিরোধী জোট ‘সি৬৪’ চলতি সপ্তাহে কাবিলার বিদ্রোহকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে; তারা বলেছে, কঙ্গোর নিরাপত্তা সংকট শুধু সামরিক উপায়ে সমাধান করা যাবে না এবং তারা শিসেকেদি ও কাবিলা—দুজনের সঙ্গেই সরাসরি আলোচনা চায়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গ্রেট লেকস বিশ্লেষক রিচার্ড মনক্রিফ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট শিসেকেদির হাতে এখনো বড় সুবিধা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘শিসেকেদির শক্তিশালী আমেরিকান সমর্থন আছে। তাঁর প্রচুর অর্থ আছে। আর তিনি সাধারণভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং, যতদূর দেখা যায়, সামরিক ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করেন।’ কাবিলাকে এফআরএন নেতা করার খবরে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ায় শিসেকেদি গত সপ্তাহে বলেন, ‘আমার মতে, এটি কেবল প্রমাণ করে যে তিনি কখনোই এই দেশকে ভালোবাসেননি, এর বাসিন্দাদের তো আরও কম।’
দুজনের সম্পর্কের পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন। ক্যাথলিক চার্চের পর্যবেক্ষকদের ফাঁস হওয়া ফল অনুযায়ী ওই নির্বাচনের প্রকৃত বিজয়ী ছিলেন মার্টিন ফায়ুলু। ওই নির্বাচনের ফল ঘোষণাকারী সাবেক নির্বাচনপ্রধান কর্নেই নাঙ্গা এখন কাবিলার একজন ডেপুটি; তিনি দাবি করেছেন, চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই কাবিলা ও শিসেকেদির মধ্যে রাজনৈতিক চুক্তি হয়েছিল এবং সেই চুক্তি খসড়া করতে তিনি নিজেই সাহায্য করেছিলেন। শিসেকেদি বরাবর বলে আসছেন, তিনি বৈধভাবেই নির্বাচনে জিতেছিলেন।
নির্বাচনের পর দুজনের ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভেঙে যায়, যখন শিসেকেদি সংসদে কাবিলার আধিপত্য ভেঙে নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়তে এগিয়ে আসেন। সাবেক মিত্ররা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন এবং কাবিলা দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান। তিনি ২০২৫ সালে কঙ্গোতে ফিরে বিদ্রোহীদের দখলে থাকা গোমায় হাজির হন; ওই বছরের সেপ্টেম্বরে একটি সামরিক আদালত পূর্ব কঙ্গোতে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সহিংসতায় অর্থায়নের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।


