জানাজার পরের জীবন: ইয়েমেনের যুদ্ধে নিহতদের পরিবারের ঘাড়ে বাড়ছে দুর্দশার বোঝা
ইয়েমেনের রাজধানী সানার রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যেই পিকআপে করে নিয়ে যাওয়া হয় নিহত হুথি যোদ্ধাদের মরদেহ। পিকআপের পেছনে বন্দুকধারীরা মরদেহের সঙ্গে কবরস্থান পর্যন্ত যান, আর চলন্ত গাড়ি থেকে জোরে বাজতে থাকে ‘আমাদের শহীদরাই আমাদের গৌরব’ গানটি। কবরস্থানে শোকার্তরা নিহতদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনে যোদ্ধাদের জানাজা নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। এ মাসের শুরুর দিকে ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, তাদের বাহিনী ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৪০ জন হুথিকে হতাহত করেছে। গত সপ্তাহে সরকার আরও জানায়, ৫ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ১০০ হুথি সদস্য ও কমান্ডার নিহত বা আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে হুথিরাও গত কয়েক সপ্তাহে সরকারপক্ষের শত শত সেনাকে হত্যা করেছে। ১৯ অক্টোবর শাবওয়ায় একটি নিরাপত্তা শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭০ জনের বেশি সরকারি সেনা নিহত হন।
কিন্তু কবরস্থানে পাওয়া ক্ষণিকের এই জনসম্মানের পর নিহত যোদ্ধাদের পরিবারগুলোর জীবনে থেকে যায় দীর্ঘ শোক আর কষ্ট। তাদের জন্য জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে, অর্থনৈতিক দুর্দশা গভীর হয়েছে এবং দুঃখ যেন নিত্যসঙ্গী।
সানার ২৩ বছর বয়সী বাসিন্দা আকরাম আল জাজিরাকে বলেন, ‘১০ অক্টোবর আমার ভাই আব্দুলাজিজের শহীদ হওয়া আমাদের ভেঙে দিয়েছে, মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। আমরা যন্ত্রণা লুকাতে হাসতে পারি, কিন্তু হৃদয় ভরে আছে অতল শোকে।’
আকরাম জানান, ২১ বছর বয়সী আব্দুলাজিজ হুথি গোষ্ঠীর হয়ে লড়াই করতে গিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের ধুবাবে নিহত হন। হুথিদের দলে যোগ দেওয়ার মাত্র দুই মাস পরই তার মৃত্যু হয়।
সামনের সারিতে যাওয়ার আগে দুই ভাই সানায় নির্মাণ বা কৃষিকাজে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। কাজ পেলে দুজনের আয় মিলিয়ে ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চলত। আকরামের ভাষায়, তাতে পরিবারের আর্থিক কষ্টটা ‘সামলানো যেত’। এখন ভাইকে ছাড়া পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
আকরাম বলেন, ‘আমি আমার শক্তির স্তম্ভ আব্দুলাজিজকে হারিয়েছি। তার আয় আর আমার আয় মিলেই পানি, বিদ্যুৎ আর খাবারের খরচ চলত। তাকে ছাড়া আমি যেন এক ডানার পাখি, কাঁধে এত দায়িত্বের বোঝা।’
গত কয়েক দিনে হুথি-নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে। এতে নিত্যপণ্যের দাম আরও বেড়ে আকরামের মতো সংগ্রামরত পরিবারগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে।
আকরাম বলেন, ‘পানি, বিদ্যুতের বিল দেওয়া বা বাজার করার বেলায় আপনার স্বজন শহীদ কি না, সেটা কোনো ব্যাপার না। হয় টাকা দিতে হবে, নয়তো না খেয়ে মরতে হবে।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এবং দেশের একাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই বড় আকারে বেড়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) কর্মসূচি কার্যক্রমবিষয়ক সহকারী নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিউ হলিংওয়ার্থ এ মাসের শুরুর দিকে বলেন, এই সর্বশেষ উত্তেজনা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ‘একেবারে বিধ্বংসী’ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক ক্ষুধা সংকটের দিকে তাকিয়ে আছি, যা এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরও বাড়বে।’
হুথিরা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে এবং পরে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। সেই থেকে সংঘাতের কোনো মীমাংসা হয়নি।
হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার অনেক নিহত যোদ্ধার পরিবারের মতো আকরামের পরিবারকেও হুথি কর্তৃপক্ষ একটি খাদ্য ঝুড়ি দিয়েছে, যাতে ছিল ময়দা, রান্নার তেল, চাল ও চিনি। তবে নিহত এক যোদ্ধার বাবা, সানার বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী আলী ইয়াহিয়া আল জাজিরাকে জানান, খাদ্য বা আর্থিক সহায়তার এই জোগান অনিয়মিত।
ইয়াহিয়া বলেন, ‘আমার ছেলে চার বছর আগে সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে সানাভিত্তিক সরকারের হয়ে লড়াই করতে গিয়ে নিহত হয়। তারপর থেকে আমি বিভিন্ন সময় খাদ্য ঝুড়ি পেয়েছি। কখনো বছরে দুবার, কখনো তিনবার, আবার কখনো চারবার পাই।’
ইয়াহিয়ার মতে, এই সহায়তা যথেষ্ট নয়। তার যুক্তি, ‘ন্যায্য ক্ষতিপূরণ’ হলে পরিবার প্রতি মাসে অন্তত ২০০ ডলার বেতন পেত। তিনি বলেন, ‘এই পরিমাণ অর্থে একটি পরিবার প্রতি মাসে মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে পারত।’
ইয়াহিয়ার আরও দুই ছেলে তাকে দেখভাল করেন—একজন সানায় ডেলিভারি রাইডার, আরেকজন একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। ইয়াহিয়া বলেন, ‘তাদের সহায়তায় আমার জীবনযাত্রার অবস্থা ভালো হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিবার যদি যোদ্ধার আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে যোদ্ধার মৃত্যু পুরো পরিবারের জন্য জীবনযন্ত্রণা ও মানসিক যাতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
ডব্লিউএফপির হিসাবে, ইয়েমেনজুড়ে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে আছেন, আর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।
সামনের সারিতে নিহত যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকায় শোকাহত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের ওপর চাপে পড়ছে বলে সানায় হুথি প্রতিনিধি আলী মোহাম্মদ আল জাজিরাকে জানান। তিনি বলেন, ‘আজ শহীদের সংখ্যা অনেক বেশি, তাদের পরিবার যথাযথ সহায়তা পাওয়ার দাবিদার। তবে শহীদের সংখ্যা বাড়ায় তারা যে মাত্রায় সহায়তা পায়, তাতে প্রভাব পড়ছে। সহায়তা এমনভাবে বণ্টন করা হয় যাতে প্রতিটি পরিবার কিছু না কিছু পায়।’
২৫ অক্টোবর সানাভিত্তিক হুথি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অনেক হুথি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শহীদ দিবস পালন করে। অনুষ্ঠানে ক্রীড়া খাতের উপসচিব আলী হাদবান এ দিবস পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এতে ‘ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া’ যায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন ফ্রন্টে অর্জিত বিজয় এসব শহীদের আত্মত্যাগেরই সরাসরি ফল এবং তাদের পরিবারকে সহায়তা ও যত্ন দেওয়া প্রয়োজন।
২০২১ সালের শেষে জাতিসংঘের হিসাবে, ইয়েমেনের যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন। লড়াই আবার শুরু হওয়ায় আরও প্রাণ ঝরেছে।
সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আদেল দাশেলা নিহত যোদ্ধাদের প্রকাশ্যে উদ্যাপনকে যুদ্ধের সময় উদ্ভূত একটি ‘বিদেশি চর্চা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই চর্চা সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং শিশুদের নানা সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে জীবনের ঝুঁকি নিতে ও মরতে উৎসাহিত করে। হুথি গোষ্ঠী রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগে ইয়েমেনিরা এমন ঘটনা দেখেনি।’
দাশেলা বলেন, পরিবারগুলো এসব আচারে অংশ নিতে উৎসাহিত হতে পারে, আবার সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে তা করতে বাধ্যও হতে পারে। ‘কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রকাশ্য সম্মান প্রদর্শন পরিবারগুলোর কষ্ট কমায় না। বরং তাদের ক্ষতির সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক পরিণতি তাদেরই বয়ে বেড়াতে হয়,’ বলেন তিনি।
অনেক ক্ষেত্রে উপার্জনকারীর মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব নেন নারী ও শিশুরা। দাশেলা বলেন, ‘এভাবেই এসব ক্ষতির আসল মূল্য দিতে হয় নারী ও শিশুদের, আর প্রকাশ্য উদ্যাপন তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা ও শোকাহত পরিবারগুলোর চলমান দুর্দশা থেকে বিচ্ছিন্নই থেকে যায়।’


