মাগুরায় যুবদল নেতা হত্যা ও ১৫০ ভরি সোনা ডাকাতির যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা গ্রেপ্তার

মাগুরায় যুবদল নেতা শাকের হোসেন হত্যা ও দেড় শ ভরি সোনা ডাকাতির ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ। এই দুই ঘটনায় মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী এলাকার একটি বাড়ি থেকে ডাকাতির পাঁচটি সোনার বার জব্দ করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মারুফকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্রবার বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে সোনা ডাকাতির মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
তবে যুবদল নেতা হত্যার সঙ্গে সোনা ডাকাতির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক আহমেদ মারুফের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থে উদ্ধার করা সোনার পরিমাণসহ বিস্তারিত জানাতে তিনি রাজি হননি।
গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে গুলিতে নিহত হন শাকের হোসেন (৩৯)। তিনি মাগুরা পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন।
হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার রাতেই শাকেরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঢাকা মহানগর যুবদলের সদস্য রনি শিকদার ও তাঁর বান্ধবী শামীমা তাবাসসুম লুবনাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে, বিশেষ করে লুবনার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনার চালান ডাকাতির বিষয়টি সামনে আসে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
এরপর গত মঙ্গলবার ঝিনাইদহের সোনা ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারকে (৫৫) সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ঝিনাইদহ শহরের গীতাঞ্জলি সড়কে গিনি হাউস নামের একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং বর্তমানে যুবদল নেতা হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
সোনা ডাকাতির মামলাটি করেন সোনা ব্যবসায়ী মো. মজিবর রহমান। গত ২৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে করা মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মাগুরা সদর উপজেলার রামনগর বাজার এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
এজাহার অনুযায়ী, মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাসিন্দা মজিবর রহমান ঢাকার তাঁতীবাজারের পীযূষ নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫০ ভরি সোনা সংগ্রহ করেন। সেগুলো ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন।
বাসটি রামনগর বাজার এলাকায় পৌঁছালে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাসটি থামায়। এরপর তারা মজিবর রহমানকে জোর করে বাস থেকে নামিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁকে মারধর করে তাঁর প্যান্টের বেল্টের নিচে তৈরি পকেট থেকে ১৫০ ভরি তেজাবি সোনার দণ্ড ও নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। লুট হওয়া সোনার মূল্য ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
ডাকাতি মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান। তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে — পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ার বাসিন্দা মো. জুয়েল হোসেন, তৌকির আহমেদ, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফ হোসেন ও তাঁর শ্বশুর ফরিদ মণ্ডল। জুয়েল ও তৌকিরকে বুধবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁরা কারাগারে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা হয় ফরিদ মণ্ডলকে।
হত্যা মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেলে আসামি মারুফ হোসেনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
লুট করা সোনা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরেই শাকের হোসেন খুন হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। এই ঘটনায় জেলা শহরে বসবাসকারী যুবদলের কয়েকজন নেতাসহ বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে এবং মারুফ গ্রেপ্তারের পর তাঁদের কয়েকজন গা ঢাকা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন শুক্রবার বিকেলে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করছি না। আশা করছি, শিগগিরই হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে। গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনার পাঁচটি টুকরা জব্দ করা হয়েছে। ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে পুলিশের তদন্ত চলছে।’




