পেঁয়াজ সংরক্ষণে বাকৃবি গবেষকদের আইওটি প্রযুক্তি: পরীক্ষায় ওজনহ্রাস কমেছে, বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজ বেড়েছে

পেঁয়াজ সংরক্ষণে পচন, অঙ্কুর গজানো ও ওজন কমে যাওয়ার ক্ষতি কমাতে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। পেঁয়াজের মৌসুমে দাম কমে গেলে কৃষকেরা অনেক সময় উৎপাদন খরচ তুলতে পারেন না। আবার বেশি দামের আশায় পেঁয়াজ মজুত রাখলেও উপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে পচন, অঙ্কুর গজানো ও ওজন কমে তারা লোকসানে পড়েন।
পরীক্ষায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারে পেঁয়াজের ওজনহ্রাস কমার পাশাপাশি বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বেড়েছে। গবেষকদের তথ্যমতে, প্রায় ৫০০ কেজি পেঁয়াজ ধারণক্ষমতার এই প্রযুক্তি তৈরি ও স্থাপনে আনুমানিক ২৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সংরক্ষণে ক্ষতি ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে বলে তারা জানিয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিটি ১ হাজার কেজি পেঁয়াজ সংরক্ষণের উপযোগী করেও তৈরি করা সম্ভব।
গবেষণাটির শিরোনাম ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অব আ লো-কস্ট আইওটি-অ্যাসিস্টেড অনিয়ন স্টোরেজ সিস্টেম ফর রিডিউসিং পোস্টহারভেস্ট লসেস ইন বাংলাদেশ’। ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট জার্নাল অব ফুড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
গবেষক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী। দলের অন্য সদস্যরা হলেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাফিস সাদিক সায়েম ও সাগর চৌধুরী এবং স্নাতক শিক্ষার্থী এম. রাহাত মিয়া, আনিসুর রহমান ও আল আমিন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
গবেষকদের তৈরি ব্যবস্থায় সংরক্ষণকক্ষের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। গ্যাস সেন্সরের সাহায্যে পচনের সঙ্গে সম্পর্কিত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার পরিবেশের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান চালু বা বন্ধ করতে পারে। ফলে সংরক্ষণকক্ষের ভেতরে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
এটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নয়। সেন্সরের তথ্যের ভিত্তিতে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সংরক্ষণকক্ষের পরিবেশ উন্নত করাই এই প্রযুক্তির কাজ। পরীক্ষায় আইওটিনির্ভর ব্যবস্থায় তাপমাত্রা ১৮ দশমিক ৮১ থেকে ২৮ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৫৪ দশমিক ৩২ থেকে ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশের মধ্যে ছিল। প্রচলিত কৃষক পর্যায়ের সংরক্ষণব্যবস্থার তুলনায় এতে পরিবেশের স্থিতিশীলতা বেশি পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণের সময় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে পেঁয়াজের ওজন কমে যায়, অঙ্কুর গজায় এবং পচন দেখা দেয়। তুলনামূলক কম খরচে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এসব ক্ষতি কমানোই তাদের গবেষণার উদ্দেশ্য।
গবেষণায় মুরিকাটা জাতের ১৩৪ কেজি পেঁয়াজ প্রায় ৮০ দিন সংরক্ষণ করে আইওটিনির্ভর ব্যবস্থা ও প্রচলিত পদ্ধতির ফলাফল তুলনা করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে পেঁয়াজের মোট ওজনহ্রাস ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় তা কমে ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ওজনহ্রাসের হার কমেছে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।
প্রচলিত পদ্ধতিতে বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ ছিল ৬৮ দশমিক ২২ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৭৬ দশমিক ৮১ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজে প্রায় ৮ দশমিক ৫৯ কেজি বেশি পেঁয়াজ বাজারজাত করার উপযোগী ছিল। অঙ্কুর গজানোর কারণে ক্ষতির হারও ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশে নেমেছে। তবে পচে যাওয়া পেঁয়াজের ক্ষতির ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতির মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পচন শনাক্তকরণে ব্যবহৃত গ্যাস সেন্সরটি গড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। প্রতি ৫০০ কেজি পেঁয়াজের ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতিতে বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণের পার্থক্য ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সে হিসাবে নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ৪৩ কেজি বেশি পেঁয়াজ বাজারজাতযোগ্য হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি কতটা সাশ্রয়ী হবে, তা নির্ভর করবে যন্ত্রটির স্থায়িত্ব, বছরে ব্যবহারের সংখ্যা ও পরিচালনব্যয়ের ওপর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪২ লাখ ৬৪ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বিপরীতে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। এরপরও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৮৬ হাজার ৪০০ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। সংরক্ষণ ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী জানান, প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করা এবং বাস্তব সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, তারা পেঁয়াজের পাশাপাশি আলু ও রসুন নিয়েও এর কার্যকারিতা যাচাই করছেন। যন্ত্রটি পুরোপুরি সোলার প্যানেলে চালানো যায়, এমন ব্যবস্থা নিয়েও কাজ চলছে। ফলাফল সন্তোষজনক হলে কৃষক ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী মডেল তৈরি করা সম্ভব বলে তারা আশা করছেন।




