যুদ্ধে স্টুডিও ধ্বংস হলেও ঐতিহ্য বাঁচাতে লড়ছেন সুদানের শিল্পীরা
সুদানের যুদ্ধে স্টুডিও, গ্যালারি আর কাজের সরঞ্জাম হারিয়েও দেশটির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে লড়ছেন শিল্পীরা। খার্তুম থেকে পালিয়ে পোর্ট সুদানে আশ্রয় নেওয়া চিত্রশিল্পী ও নাট্যনির্দেশক আওয়াদ হারুনের (৪৫) গল্প সেই লড়াইয়েরই একটি উদাহরণ।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও আধা সামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে লড়াই শুরু হলে আওয়াদ খার্তুম নর্থের আল-হালফায়ায় নিজের বাড়ি ছেড়ে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে পোর্ট সুদানে চলে যান। পালানোর সময় তিনি সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন মাত্র দুটি শার্ট, দুই জোড়া ট্রাউজার, দুটি বই আর কয়েকটি ছেঁড়া আঁকার কাগজ; ভেবেছিলেন শিগগিরই ফিরতে পারবেন। কিন্তু বাড়ির পাশাপাশি তিনি হারিয়েছেন কাজের জায়গা এবং জীবিকা নির্বাহের সরঞ্জামও।
পোর্ট সুদানে এসে ভাস্কর্য, নকশা ও সাজসজ্জার কাজে কিছু আয়ের চেষ্টা করেন আওয়াদ। তিনি আহালিনা কালচারাল গ্রুপ ও ইউনেস্কোর অংশীদারত্বে আয়োজিত ওয়াসেল ফেস্টিভ্যালে নাটকে অংশ নিয়েছেন এবং সাংস্কৃতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কর্মশালা পরিচালনা করেছেন।
আওয়াদ ২০১৩ সালে একদল তরুণকে নিয়ে আহালিনা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন; নাটক, চারুকলা, সংগীত ও পুতুলনাচের মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে শান্তি ও সামাজিক সংহতি প্রচারই ছিল এই গোষ্ঠীর কাজ। শিশুদের জন্যও ছবি আঁকা, গল্প বলা, সংগীত ও খেলা নিজেদের প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে।
আল জাজিরাকে আওয়াদ বলেন, “সরঞ্জাম হারানো মানে দক্ষতা হারানো নয়, আর কাজের জায়গা হারানো মানে সৃষ্টির ক্ষমতা হারানো নয়।” বাস্তুচ্যুত অন্য শিল্পীদের সঙ্গে তিনি পোর্ট সুদানের একটি পুরোনো স্কুলে আশ্রয় পেয়েছেন, যেখানে তাঁরা ভবনটি পরিষ্কার করে ঘরহারা পরিবারগুলোর থাকার উপযোগী করেছেন। তবে উচ্ছেদের আশঙ্কায় তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত; আওয়াদের ভাষায়, “এখন উচ্ছেদের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ আমাদের অনিশ্চয়তায় ফেলেছে—এরপর আমরা কোথায় যাব জানি না।”
আওয়াদের বিশ্বাস, শিল্প হারানো বাড়ি ফিরিয়ে দিতে বা যুদ্ধ থামাতে পারে না, কিন্তু এটি স্মৃতি সংরক্ষণ করতে, সম্প্রদায়গুলোকে একত্র করতে এবং শিশুদের খেলা ও আত্মপ্রকাশের জায়গা দিতে পারে। আহালিনা গোষ্ঠীর মূলমন্ত্র “ছাই থেকে আমরা আবার উঠে দাঁড়াব”—আওয়াদের কাছে এটি শুধু স্লোগান নয়, যুদ্ধ যা যা কেড়ে নিয়েছে তার পরও সৃষ্টি চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
যুদ্ধ সুদানের সাংস্কৃতিক জীবনে ভারী আঘাত হেনেছে; ঐতিহ্যবাহী স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সারা দেশে শিল্পীদের জীবিকা ব্যাহত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ইউনেস্কো হিসাব করে দেখেছে, সুদানের সাংস্কৃতিক খাতে তহবিল ঘাটতি ৩ কোটি ডলার। তবে এই সংখ্যার আড়ালে রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত ক্ষতি—যুদ্ধে নিহত শিল্পীরা, কিংবা স্টুডিও, গ্যালারি, শিল্পকর্ম ও সরঞ্জাম ফেলে পালাতে বাধ্য হওয়া মানুষেরা।
২০২৪ সালের এপ্রিলে ইউনেস্কো জানায়, পোর্ট সুদানে আর্টিস্টস অ্যান্ড রাইটার্স ইউনিয়ন ১১২ জনের বেশি বাস্তুচ্যুত শিল্পী ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পেশাজীবীকে আশ্রয় দিয়েছে। আর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংস্থাটি জানায়, পোর্ট সুদানে তাদের উদ্যোগে ৩৫০ জনের বেশি শিল্পী, নারী, মেয়ে ও বাস্তুচ্যুত সাংস্কৃতিক পেশাজীবী উপকৃত হয়েছেন।
সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা আসিম আবদেল আজিজ (৩১) ক্রমবর্ধমান লড়াই ও বারবার ড্রোন হামলার মধ্যে উত্তর কর্দোফান রাজ্যের রাজধানী এল ওবেইদ ছেড়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে পোর্ট সুদানে আসেন নিরাপত্তা ও কাজের আশায়। ওমদুরমান ও এল ওবেইদে ছড়িয়ে থাকা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন আসিম বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের আশ্রয়কেন্দ্রে একা থাকেন। পোর্ট সুদানে তিনি স্থানীয় আর্টিস্টস অ্যান্ড রাইটার্স ইউনিয়ন, ইউনেস্কো ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন, সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও ঘৃণামূলক বক্তব্য ও বর্ণবাদের মতো সামাজিক সমস্যা নিয়ে সংগীত অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করেছেন।
আসিম বলেন, যুদ্ধ ঘৃণামূলক বক্তব্যকে উসকে দিয়েছে এবং সুদানের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন গভীর করেছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আমি নিজে দেখেছি ঘৃণামূলক বক্তব্য মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলে। সংগীতের মাধ্যমে আমি সুদানি জনগণকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে আমরা সবাই ভাই-বোন, এবং যুদ্ধ আমাদের পরিচয় নয়।” এক বছর আগে তিনি মোখালায়া নামে একটি প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার কাজ সারা দেশের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও ছন্দ নথিভুক্ত ও সংরক্ষণ করা। তাঁর আশা, প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক উৎসবে নিয়ে গিয়ে বিদেশি দর্শকদের সুদানের সমৃদ্ধ সংগীত ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত করানো।
রেড সি রাজ্যের রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস ইউনিয়নের সম্পাদক আবদেল কাদের হাশেম আল জাজিরাকে বলেন, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউনিয়ন সুদানের অন্যান্য এলাকার লড়াই থেকে পালিয়ে আসা শিল্পী ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা দিয়ে আসছে। তিনি বলেন, “আমরা পোর্ট সুদানের একটি স্কুলে বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র গড়তে কাজ করেছি এবং তাঁদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা চেয়েছি।” আশ্রয়ের পাশাপাশি ইউনিয়ন বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে সহায়তা করেছে এবং মাদকের বিপদসহ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচিতে যুক্ত করেছে। ইউনেস্কোর সঙ্গে অংশীদারত্বে বাস্তুচ্যুতি শিবিরের শিশুদের কংক্রিটের হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণের প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। হাশেম আরও বলেন, সুদানি সেনাবাহিনী রাজধানী খার্তুম পুনর্দখলের পর বাস্তুচ্যুত শিল্পীদের অধিকাংশই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।


