…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আন্তর্জাতিক › খবর
আন্তর্জাতিক

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি থেকে সরে আসার দাবি ইরানের আইনপ্রণেতাদের, ট্রাম্প বললেন যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরানের কয়েকজন আইনপ্রণেতা দেশটিকে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে আসার দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শিগগিরই গুটিয়ে আনা হবে। কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এই সপ্তাহে তেহরানে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করার সময়েই এই দাবি উঠল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগেও ওমানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ পরমাণু আলোচনা চলছিল। ইরান বহুবার বলেছে, পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। ট্রাম্পও বারবার বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র পেতে পারে না; চলমান সংঘাত শেষ করা ও স্থায়ী চুক্তির জন্য এটিকে তিনি অনড় শর্ত করেছেন।

অন্যদিকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আবার আলোচনায় বসার আগে ইরান কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের অবসান, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আর কোনো হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা।

নবম মাসে পড়া এই যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের জ্বালানি ও আর্থিক বাজার টালমাটাল হয়ে পড়েছে। শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের বক্তব্যের জবাব দেন। মের্ৎস বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপের জ্বালানি খরচ ১০০ বিলিয়ন ইউরোর (১১২ বিলিয়ন ডলার) বেশি বেড়েছে।

এক্সে দেওয়া পোস্টে আরাগচি স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে মের্ৎস স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, এটি হলো সেই নোংরা কাজ, যা ইসরায়েল আমাদের সবার জন্য করছে। এরপর আরাগচি হুঁশিয়ারি দেন, নতুন করে হামলা হলে ইউরোপকে আরও অনেক বেশি মূল্য দিতে হতে পারে। তিনি লেখেন, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী যারা তাদের জনগণের ক্ষতি করার সাহস করবে, তাদের যে পৃথিবী কাঁপানো আঘাত দেবে, তার তুলনায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো কিছুই নয়; লাল রেখা এখন অতীতের বিষয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এনপিটি থেকে সরে আসার দাবি জোরালো হয় শনিবার, যখন ইরানি আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাভিয়ান এক্সে লিখে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার ও পরমাণু নীতি বদলের আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার ভারী মূল্য দেওয়ার পর এখন ইরানি জাতির সময় এসেছে এনপিটি থেকে সরে এসে পরমাণু নীতি বদলানোর।

পার্লামেন্টে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি বলেছেন, চুক্তি থেকে সরে আসার ১০টি প্রস্তাব নথিভুক্ত হয়েছে এবং বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে বলে ফার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, ইরানি রাজনীতিক ও পণ্ডিত মোহাম্মদ জাভেদ হাজ আলি আকবরি শুক্রবারের খুতবায় পরমাণু নীতি পর্যালোচনার দাবিকে জাতীয় দাবি বলে বর্ণনা করেছেন; তাঁর মতে, এটি তাড়াহুড়ো বা আবেগের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা সম্পর্কে ইরানিদের সচেতনতার প্রতিফলন।

এর আগে এই সপ্তাহেই ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা এনপিটি থেকে সরে আসার দাবির খবর দিয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মিলে গেছে বলে অভিযোগ করে। গত মাসে আইএইএর এক প্রস্তাবে এনপিটির অধীনে ইরানের বাধ্যবাধকতা পালনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়।

তবে ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে আইএইএ ইরানের প্রধান পরমাণু স্থাপনাগুলোতে প্রবেশাধিকার পায়নি; ওই যুদ্ধে ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের মতো স্থাপনায় হামলা হয়। ইরান আইএইএর প্রস্তাবকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা করেছে।

এনপিটি হলো পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে করা যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক চুক্তি। ১৯৬৮ সালের ১ জুলাই স্বাক্ষরের জন্য এটি উন্মুক্ত হয় এবং কার্যকর হয় ১৯৭০ সালের ৫ মার্চ; চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য। এখন ১৯১টি দেশ এই চুক্তির অংশ; ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও দক্ষিণ সুদান এতে স্বাক্ষর করেনি। চুক্তির একটি ধারায় বলা আছে, কোনো দেশ তার সর্বোচ্চ স্বার্থ বিপন্ন হয়েছে মনে করলে তিন মাসের নোটিশ দিয়ে সরে আসতে পারে। ইরান ১৯৬৮ সালের জুলাইয়ে এনপিটিতে স্বাক্ষর করে এবং ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে তা অনুসমর্থন করে; দেশটি ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও গবেষণার জন্য।

আইনপ্রণেতাদের এই দাবিতে ইরানের নেতারা এখনো সাড়া দেননি। এর আগে ২৪ অক্টোবর রক্ষণশীলদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কট্টরপন্থী পায়দারি ফ্রন্টও পার্লামেন্টকে এনপিটি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছিল বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এনপিটি থেকে সরে এলেই যে ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাবে, তা নয়। পরমাণু অস্ত্র না চাওয়ার বিষয়ে ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো বদলায়নি। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরানের নীতি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় নির্দেশনার সঙ্গে মিলে যায়। জুনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগায়ি বলেছিলেন, আইনপ্রণেতারা এনপিটি থেকে সরে আসার বিল তৈরি করছেন; সরকারকে পার্লামেন্টের বিল কার্যকর করতে হয়, তবে প্রস্তাবটি এখনো প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে পার্লামেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প শুক্রবার রাতে ফ্লোরিডার ডেটোনা বিচে দেওয়া বক্তৃতায় ইরান প্রসঙ্গ বারবার টেনে তার নৌ ও বিমানবাহিনী ধ্বংসের দাবি পুনরাবৃত্তি করে বলেন, তারা কখনোই পরমাণু অস্ত্র পাবে না। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছে—এমন দাবি তিনি অস্বীকার করে বলেন, এই যুদ্ধ তারা অনেক বছর আগে শুরু করেছে এবং ইরান ১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। একই দিন কানসাস সিটির রেডিও স্টেশন কেসিএমওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ শিগগিরই গুটিয়ে আনা হবে, তবে ওয়াশিংটনের দরকার এমন নিশ্চয়তা যে কখনো পরমাণু অস্ত্র হবে না।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক মোহামেদ এলমেনশাউয়ি আল জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্প শান্তি হোক বা যুদ্ধ—যত দ্রুত সম্ভব এই অচলাবস্থার অবসান চান এবং ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন হামলা শুরু করতে পারেন। তাঁর মতে, এই না-শান্তি না-যুদ্ধ অবস্থা ভাঙবে হয় আলোচনার পথে অগ্রগতিতে, নয়তো আবার হামলা শুরু হলে। তিনি বলেন, ট্রাম্প মনে করেন সময় তাঁর পক্ষে—কারণ ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধে তেহরানের তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়েছে, ইরানি বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং অন্য কয়েকটি দেশ স্থলসীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এলমেনশাউয়ির মতে, ইসরায়েলের দিক থেকে হামলা শুরুর চাপ আর আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর দিক থেকে আলোচনার পথে এগোনোর চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ট্রাম্প যেকোনো দিকে ঝুঁকতে পারেন।

শনিবার ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া এক্সে ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, তাঁদের সশস্ত্র বাহিনী অঞ্চলে আমেরিকার গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে অঞ্চলে আরেকটি অভিযানে গেলে ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে পাল্টা জবাব দেবে এবং যুদ্ধের আগুন আরও অনেক বড় এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরও খবর

ইরানের ওপর হামলা ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে সৌদি আরব
আন্তর্জাতিক

ইরানের ওপর হামলা ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে সৌদি আরব

ইরানের ওপর হামলা বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সৌদি আরব। শনিবার আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তে…

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধে স্টুডিও ধ্বংস হলেও ঐতিহ্য বাঁচাতে লড়ছেন সুদানের শিল্পীরা

সুদানের যুদ্ধে স্টুডিও, গ্যালারি আর কাজের সরঞ্জাম হারিয়েও দেশটির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে লড়ছেন শিল্পীরা। খার্তুম থেকে পালিয়ে পোর্ট সুদানে …

আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাস্তুচ্যুত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ, ঝুঁকিতে ৬ হাজার ১০০ গর্ভবতী নারী

ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় গত আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দ…

সিয়েনা ড্রোন ফটো পুরস্কারে সেরা ছবি বাংলাদেশের জাহাজভাঙার: চট্টগ্রামের কাদামাটিতে এলএনজি ট্যাংকার ভাঙার দৃশ্য জিতল শীর্ষ সম্মান
আন্তর্জাতিক

সিয়েনা ড্রোন ফটো পুরস্কারে সেরা ছবি বাংলাদেশের জাহাজভাঙার: চট্টগ্রামের কাদামাটিতে এলএনজি ট্যাংকার ভাঙার দৃশ্য জিতল শীর্ষ সম্মান

বাংলাদেশ উপকূলে জাহাজভাঙার একটি আকাশ থেকে তোলা ছবি জিতেছে ২০২৬ সালের সিয়েনা ড্রোন ফটো পুরস্কারের সর্বোচ্চ সম্মান। আলোকচিত্রী জর্জ স্টেইনমেৎজের তোলা ছ…