লংমার্চ নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থান: বাধা নয়, নৈরাজ্য হলে রাজনৈতিক মোকাবিলা

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসনসহ সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে লংমার্চ পালন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এই কর্মসূচি ঘিরে ক্ষমতাসীনদের অবস্থানও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবার ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে এই কর্মসূচি শুরু হয়। দ্বিতীয় দফা হয় ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে। সর্বশেষ শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে হয়েছে তৃতীয় লংমার্চ।
সামনে বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগেও একই কর্মসূচি রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের।
শনিবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করে গণরায়কে উপহাস করার বিষয়টি প্রতিহত করতে আরেকটি বিপ্লবের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
এর আগের দিন শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে; মুজিববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং এই দুর্নীতিবাজ মাফিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আবারও রাস্তায় নামতে হবে।
ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে দেখছেন। তবে আন্দোলনের নামে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইলে তাঁরা বসে থাকবেন না; প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।
বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তাঁরা সব সময় গণতান্ত্রিক আচরণে বিশ্বাসী। তাই বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে প্রশাসনিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। অতীতে বিএনপিসহ বিরোধী দলের আন্দোলনে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিরোধী দল তাদের আন্দোলন স্বাধীনভাবেই করছে। দল বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হচ্ছে না, কারণ তাঁরা পরমতসহিষ্ণু। তবে বিরোধী দল অহেতু আন্দোলন করে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইলে সাধারণ মানুষই তা প্রতিহত করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দুদু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা পতিত ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে হাত মেলালে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিএনপি কারও কাজে বাধা দেবে না; তবে কেউ নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা হবে। আপাতত নির্বাচনি ইশতেহার পূরণ করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য বলেও জানান তিনি।
বিরোধী শিবির থেকে ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দল এখন পর্যন্ত সঠিক পথেই আছে এবং সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করছে। কিন্তু সরকার একলা চলো নীতিতে চলছে; জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। তিনি বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে চান না বলেই এখনই কঠোর আন্দোলন দেওয়া হচ্ছে না; তবে সরকার দলীয়করণ ও দুর্নীতি অব্যাহত রাখলে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেক্ষেত্রে জনগণের শক্তি নিয়েই মাঠে নামা হবে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন না করলে সরকার লাইনচ্যুত হয়ে যেতে পারে। বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি; তাই বিরোধী দল তার জায়গা থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারে। সরকার সংশোধন না হলে একসময় তার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বিরোধী দলের বক্তব্যকে ‘ফাঁকা আওয়াজ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্যে, বিরোধী দল হিসেবে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে এবং দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, বিরোধী দল নিজেদের কতটা শক্তিশালী মনে করে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে; কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও তারা সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তাদের কঠোর বক্তব্য ভিন্ন কোনো শক্তির ওপর ভরসা করে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।




