খেলাপি ঋণ ২২ হাজার কোটি থেকে ৬ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে, সংস্কারের সুফল পেতে আরও পাঁচ বছর: এমটিবি এমডি

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, একসময় দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা, এখন তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠার ২৭তম বর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং সংস্কার ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি এই মূল্যায়ন দেন।
তিনি বলেন, অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি, এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একের পর এক ধাক্কা দিয়েছে। তবে গত ১৭ বছরে ব্যাংক খাতেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক অধিগ্রহণের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
তাঁর ভাষ্য, খেলাপি ঋণের ৭০-৭৫ শতাংশ নেওয়া হয়েছে সরকারি ও রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ১০-১২টি ব্যাংক থেকে। এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় বড় অঙ্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে জ্বালানি সংকটের কথা বলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কৃত্রিমভাবে জিডিপি ও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, কিন্তু ঋণের অর্থ কোথায় গেছে, তার জবাবদিহি ছিল না।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কথা বলেন। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর জানা গেল এর নকশাই ঠিক ছিল না; যে কারণে সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণেরও অর্থনৈতিক সুফল এখনো আসেনি। এসব ক্ষেত্রে কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থ পাচারের কারণে গত সরকারের শেষ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং রিজার্ভ কমতে থাকে। কর্মসংস্থানও তেমন বাড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেন। এতে ডলার বাজার স্থিতিশীল হয়। তবে এসব সংস্কার সম্পন্ন করতে আরও পাঁচ বছর লাগবে। এরপর অর্থনীতিতে সুফল আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু ব্যাংকিং খাত দিয়ে পুরো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। দেশের অন্যতম দুর্বলতা রাজস্ব খাত। কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। সরকারের নিজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি শ্লথ হয়েছে এবং সহজ শর্তের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি উভয় উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়েছে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও চরমে।
রেমিট্যান্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের রেমিট্যান্সের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। দেশটির অর্থনীতি শ্লথ হলে লেনদেনের ভারসাম্যে বড় চাপ পড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ সময়োপযোগী হলেও ঋণগ্রহীতার যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে ব্যাংকগুলোর দুই থেকে তিন মাস লাগে। তাই রাতারাতি ঋণ বিতরণ সম্ভব নয়।
সরকারের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে স্থানীয় বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো এবং দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানসহ আট-দশটি প্রধান চালিকা শক্তি চিহ্নিত করে সেগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশে রোডশো করে বিনিয়োগ আনা যাবে না।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশ ঝুঁকি নিয়ে ৮০-৯০ শতাংশ সক্ষমতায় চালাচ্ছে। এতে যেকোনো সময় বড় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০-২০টি দেশ চিহ্নিত করার কথাও বলেন তিনি।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থ চিহ্নিত করে তা ফেরত আনতে পাঁচটি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার কাজ চলছে। তারা ‘সাকসেস ফি’ ভিত্তিতে কাজ করবে—অর্থ উদ্ধার করতে পারলেই সেখান থেকে ফি নেবে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি হলেও এতে দোষীদের কাছে বার্তা যাবে, টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে আরামে থাকা যাবে না।
আমানতের সুদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা না থাকলে ব্যাংক অতিরিক্ত আমানত দিয়ে কী করবে? সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদের হারও কমে ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশে নেমেছে। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর পরামর্শ, বেশি সুদের লোভে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখবেন না।
এমটিবির নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৯-২০ সালের দিকে ব্যাংকটির আমানত ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে ৩৩-৩৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে ঋণের ৮৯-৯০ শতাংশ ছিল বড় করপোরেট ঋণ, পরিকল্পিতভাবে তা কমিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশে আনা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে করপোরেট ঋণ ৭০ শতাংশে নামিয়ে রিটেইল ও সিএমএস খাতে ঋণের হিস্যা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
৩৭ বছরের ব্যাংকিং জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩৭ বছর ধরে মূলত প্রবৃদ্ধিশীল বাজার দেখে এসেছেন। কিন্তু এবারই প্রথম দেশের অর্থনীতিকে প্রকৃত মন্দার মুখোমুখি হতে দেখলেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে মধ্যবিত্তের অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের একত্রীকরণ অনিবার্য। বর্তমানে দেশে ৫৭টি ব্যাংক থাকলেও এর সবই টিকবে না। দেশের অর্থনীতির জন্য শীর্ষ ২০-২৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। শক্ত নীতিনির্ধারণ ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সংকট কাটিয়ে আবার স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিতে ফেরা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।


