পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর পরিবারের আতঙ্ক কাটেনি, রাতে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকেন মেয়ে ও বোন

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে দাফনের সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার ঘটনার পর থেকেই তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভয়ের কারণে নিহতের মেয়ে ও সৎ বোন নিজ বাড়িতে থাকতে না পেরে রাতের বেলা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) নিহত মানিক পশারীর মেয়ে শিমু এসব কথা বলেন। শিমু জানান, বাবাকে দাফনের পরপরই তিনি মায়ের সঙ্গে গোপালগঞ্জে চলে গিয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি পিরোজপুরের চিথলিয়া গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন, তবে তাঁর মা মনোয়ারা বেগম এখনো গোপালগঞ্জে আরেক বোনের বাসায় অবস্থান করছেন।
সরাসরি কোনো হুমকি না পেলেও দাফনের সময়কার অপ্রীতিকর পরিস্থিতির কারণে তাঁরা মানসিকভাবে শঙ্কিত রয়েছেন বলে জানান শিমু। তিনি বলেন, ‘এ কারণেই রাতে আমি এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। আর ফুফু হেনা বেগমও রাতে একই গ্রামে নিজের মেয়ে কিংবা ছেলের বাড়িতে অবস্থান করেন।’
শিমু জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি বাবা-মা, বোন ও ভগ্নিপতিকে নিয়ে গোপালগঞ্জে চলে যান। ঘটনার তিন মাস পর থেকে তিনি মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসা শুরু করেন এবং কিছুদিন একমাত্র ছেলেকে নিয়ে থেকে আবার গোপালগঞ্জে চলে যেতেন।
মানিক পশারীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কাজ করছেন এবং চায়ের দোকানেও লোকজনের উপস্থিতি স্বাভাবিক। তবে মানিক পশারীর বিষয়ে কথা বলতে এলাকার কেউ আগ্রহ দেখাননি। স্থানীয় কয়েকজন জানান, মানিক পশারীকে নিয়ে কথা বললে ঝামেলায় পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কায় তাঁরা মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, তাঁদের কেউ কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হুমকি দেননি এবং এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে। নিহতের এক চাচাতো ভাই জানিয়েছেন, তাঁরা নির্বিঘ্নে এলাকায় চলাচল করছেন এবং তাঁদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাধেশ্যাম সরকার বলেন, ‘মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের শঙ্কার বিষয়ে কেউ মৌখিক বা লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ করেননি। তবে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ নিয়মিত ওই এলাকায় টহল দিচ্ছে।’
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। টুঙ্গিপাড়ায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় গত ২৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।
পরবর্তী কালে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলে জামায়াত সমর্থিত কর্মীরা তাতে আপত্তি জানান বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে পুলিশ লাইনে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয় এবং গভীর রাতে পুলিশ পাহারায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। আলোচিত ওই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। পরবর্তী কালে ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মারা যান।




