সার্বিয়ায় ভুচিচের পতনে হাঙ্গেরির ওরবানের বিদায়েরই প্রতিচ্ছবি, দুই দেশেই জয় তরুণদের আন্দোলনের

গত নভেম্বরে উত্তর সার্বিয়ায় বৈঠকের সময় সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ ও হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবান ভাবতেও পারেননি, এক বছরের মধ্যে দুজনেই ক্ষমতার বাইরে চলে যাবেন। দুজনকেই সরিয়েছে জনআন্দোলন।
প্রথমে পতন হয় ওরবানের—এপ্রিলে তিনি পেতের মাগিয়ারের টিসজা দলের কাছে হেরে যান। এরপর গত রোববার দুই বছরেরও কম বয়সী একটি ছাত্র আন্দোলন সার্বিয়ার সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয় পায়।
হাঙ্গেরির টিসজা দল ও সার্বিয়ার স্টুডেন্ট লিস্ট একে অপরের থেকে অনেক আলাদা। টিসজা গড়ে উঠেছে তার নেতার ব্যক্তিত্ব ও শক্তিকে কেন্দ্র করে, আর সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা জোর দিয়ে বলেন, তাদের কোনো নেতৃত্বই নেই।
তবে দুই দেশেই বিপুল ভোটার উপস্থিতির পেছনে ছিলেন প্রযুক্তি-দক্ষ তরুণেরা—হাঙ্গেরিতে ভোট পড়ে ৭৯ শতাংশ, সার্বিয়ায় ৬৯ শতাংশ। তারা সংখ্যা বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম ব্যবহার করেছেন, ভোটের ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন এবং শাসক দলগুলোর ভয়ভীতি ও নির্বাচনী জালিয়াতি ঠেকাতে হাজার হাজার নির্বাচন পর্যবেক্ষককে সংগঠিত করেছেন।
সার্বিয়ার ফলাফলে হাঙ্গেরির কর্মীদের শেখানো পর্যবেক্ষণ কৌশলের ভূমিকা ছিল। গত সপ্তাহান্তে হাঙ্গেরির ডিই নাগরিক অ্যাকশন গ্রুপ ৭০ জন নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায় সার্বিয়ায়; তারা শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উত্তর সার্বিয়ার ভয়ভোদিনা প্রদেশের ভোটকেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেন। গ্রীষ্মে, নির্বাচন ঘোষণারও আগে, তারা হাঙ্গেরির নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ও পদ্ধতি সার্বিয়ার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে কর্মশালা করেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল আগেভাগে ‘সংক্রমিত’ ভোট এলাকা চিহ্নিত করা—যেসব জায়গায় আগের নির্বাচনগুলোতে শাসক দলের পক্ষে অস্বাভাবিক বেশি ভোট পড়েছিল, যা ভোটারদের ভয় দেখানো বা ‘চেইন ভোটিং’ পদ্ধতির ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
সুবোটিকার ছাত্রকর্মী পেতের ক্লেম বিবিসিকে বলেন, ‘নির্বাচনের দিন বিকেল প্রায় চারটা থেকে আমরা ভোটকেন্দ্রের কাছে মুখোশধারী হুলিগানদের—ভুচিচের সমর্থকদের—জড়ো হতে দেখি। তখন আমরা মোবাইল দল পাঠাই এবং সবকিছুর ভিডিও ধারণ শুরু করি।’ কেন্দ্রে আগেই থাকা স্থায়ী পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিটি হুমকির মুখে থাকা কেন্দ্রে ২০ থেকে ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবীর উপস্থিতি শক্ত প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করেছে এবং ভয়ভীতি বা জালিয়াতি ঠেকিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ওরবান ও ভুচিচ—দুজনকেই একসময় অপরাজেয় মনে হতো। ১৬ ও ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা এই দুই শক্তিশালী নেতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন এবং দুই দেশজুড়ে বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। প্রায় এক বছর আগে সুবোটিকার একটি ছোট, জনপ্রিয় শহরকেন্দ্রিক বেকারিতে ঐতিহ্যবাহী বুরেক পেস্ট্রির দ্রুত মধ্যাহ্নভোজে ওরবান বেছে নেন পনির, ভুচিচ মাংস। এরপর তারা যান স্থানীয় একটি ওয়াইনারিতে—তেলসহ নানা ব্যবসায়িক চুক্তি নিয়ে আলোচনায়, যার মধ্যে ছিল সার্বিয়ার নিস তেল শোধনাগারের পরিকল্পিত হাঙ্গেরীয় ক্রয়। দুই জাতীয়তাবাদী নেতার মধ্যে ব্যবসা ও রাজনীতিতে অনেক মিল ছিল; বিশেষ করে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং বসনীয় সার্বদের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিলোরাদ দোদিকের প্রতি জোরালো সমর্থন। চীনা অর্থ ও প্রযুক্তিতে বেলগ্রেড থেকে বুদাপেস্ট পর্যন্ত দ্রুতগতির রেলপথও নির্মাণাধীন।
দুই নেতার পতনের মিল আরও বিস্ময়কর। ১২ এপ্রিল ওরবান ঠিক যেভাবে হেরে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন, ভুচিচও রোববার সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে নয়টায় পরাজয় মেনে নেন। কোনো পর্যবেক্ষকই আশা করেননি, দুজনের কেউ শান্তিপূর্ণভাবে পরাজয় স্বীকার করবেন। এ সপ্তাহে জল্পনা উঠেছে, ভুচিচ রোববার রাতে দুবার ওরবানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন—একবার পরাজয় স্বীকারের আগে, আবার রাত সোয়া এগারোটায়—এবং ওরবানই তাঁর সার্ব মিত্রকে বল প্রয়োগ না করতে রাজি করান। ভুচিচ ঘোষণার আগে ওরবানের সঙ্গে কথা বলার কথা অস্বীকার করেছেন, তবে পরের কথোপকথনের কথা স্বীকার করেছেন। বিবিসির কাছে ওরবান মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সার্বিয়ায় ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে মুখোশ ও হুড পরা সতর্ক প্রহরীরা মধ্য বেলগ্রেডে অবস্থান নেয়। ভোটের দিন এ ধরনের দলকে অনেক ভোটকেন্দ্রে ছবিতে দেখা গেছে, আর নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা তাদের বাধা দিয়েছেন।
আরেকটি অদ্ভুত সংখ্যাগত মিলও আছে। সার্বিয়ার ২৫০ আসনের সংসদে স্টুডেন্ট লিস্ট পাবে ১৪০টি আসন—ঠিক একই সংখ্যক আসন পেতের মাগিয়ারের টিসজা দল পেয়েছিল হাঙ্গেরির ১৯৯ আসনের সংসদে। সেই সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের সরাসরি ফোন করে অভিনন্দন জানানো একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন মাগিয়ার—সম্ভবত একমাত্র নেতা, যাঁর কাছে তাদের নম্বর ছিল। বিবিসিকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘টিসজার গল্প অন্য জাতিদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে শুনলে সবসময় ভালো লাগে।’ ভোটের আগের দিন স্টুডেন্ট লিস্টের প্রধান ইলিয়া সারদানোভিচ বলেন, ‘হাঙ্গেরির নির্বাচনের ফল আমাদের স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা এখানে যা করছি তা ঠিক।’ রোববার সন্ধ্যায় মাগিয়ার যাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সারদানোভিচ ছিলেন তাঁদের একজন।
৬৩ বছর বয়সী ওরবান ও ৫৬ বছর বয়সী ভুচিচ—দুজনের বিরুদ্ধেই এখন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে মামলা হতে পারে। দুই দেশের বিচারব্যবস্থাও এক রকমের: সার্বিয়ার সংগঠিত অপরাধবিষয়ক বিশেষ প্রসিকিউশন সেবা জেটিওকে এবং হাঙ্গেরির একেবারে নতুন বিশেষ প্রসিকিউটর এনভিভিএইচের ক্ষমতা প্রায় একই ধরনের; তারা একে অপরের কাজে লাগতে পারে। ওরবানের ঘনিষ্ঠ হাঙ্গেরীয় কোম্পানিগুলো নোভি সাদ রেলস্টেশন নির্মাণ প্রকল্পেও যুক্ত ছিল। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর ওই স্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন; দুর্নীতি ও অবহেলাকে এর জন্য দায়ী করা হয়, আর এই ঘটনাই সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।
হাঙ্গেরির ডিই নাগরিক অ্যাকশন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আরন টিমার বিবিসিকে বলেন, ‘ইউরোপে এমন ধারণা ছিল, ওরবান ও ভুচিচের শাসন যত দীর্ঘ হবে, তারা তত শক্তিশালী হবে। আসলে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর সমাজ একবার নিজের কণ্ঠ খুঁজে পেয়ে জেগে উঠলে, তা থামানোর কোনো উপায় ছিল না।’



