জার্মানির ৩৪ শহরে জেন-জি বিক্ষোভ, ফ্রাঙ্কফুর্টে লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

জার্মানিতে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ৩৪টি শহরে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো তরুণ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখসহ বিভিন্ন শহরে এই কর্মসূচি পালিত হয়।
দিনের বেলা বিক্ষোভগুলো মূলত শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাতে ফ্রাঙ্কফুর্টে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। সেখানে হুডি ও মুখোশ পরা দাঙ্গাকারীরা অন্তত দুটি দোকানে লুটপাট চালায় এবং আরও কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট ছাড়াও বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, জরুরি সেবাদানকারী কর্মীদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা আতশবাজি, পাথর ও বোতল ছুড়লে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করা হয়। হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এই বিক্ষোভের আয়োজন করে জার্মানির ‘জেন-জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি শিক্ষার্থী সংগঠন। জার্মান ভাষায় এর অর্থ ‘জেন-জিই দায়িত্ব নিচ্ছে’। আয়োজকদের দাবি, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর চাপ বাড়ছে; শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব, সরকারি ব্যয় সংকোচনও প্রতিবাদের বিষয় ছিল।
ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, শহরের কেন্দ্রস্থলে সহিংস বিশৃঙ্খলা চলছে, কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙা হয়েছে এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা (মলোটভ ককটেল) নিক্ষেপ করা হচ্ছে। পুলিশ সাধারণ মানুষকে শহরের কেন্দ্রস্থল এড়িয়ে চলার আহ্বান জানায়। এএফপি জানিয়েছে, ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান শপিং স্ট্রিটের একটি বড় অংশ পুলিশ বন্ধ করে দেয় এবং সেখান থেকে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কর্মকর্তারা পরে জানান, ফ্রাঙ্কফুর্টে একটি বন্দুকের দোকানের জানালা ভেঙে অস্ত্র লুটের চেষ্টার পর এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে দুটি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে পুলিশ ও আয়োজকদের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনে পুলিশের হিসাবে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার বিক্ষোভকারী অংশ নেন, যা আয়োজকদের প্রত্যাশার প্রায় অর্ধেক। আয়োজকেরা প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের আশা করেছিলেন; তাদের ওয়েবসাইটে প্রায় ৩৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য উল্লেখ করা হয়।
বার্লিনের একটি সমাবেশে ‘জেন-জি রেগেল্ট’-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেন, ‘আমরা আজ এখানে যুদ্ধ ও জবরদস্তির পক্ষে নয়, বরং শান্তি ও স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই করতে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আরও ভালো সহায়তা নিশ্চিত করাই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; তারা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধী এবং দায়িত্বের বোঝা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টনের পক্ষে।
হেস রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পিসেক জানান, এই বিক্ষোভে ‘প্রায় ১০০ জন স্পষ্টভাবে চিহ্নিত বামপন্থি চরমপন্থি’ ঢুকে পড়েছিল। বিক্ষোভের এমন পরিণতিকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন।
আন্দোলনটি প্রকৃত অর্থেই তরুণদের নেতৃত্বাধীন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সংগঠনের বিস্তৃত অংশগ্রহণ রয়েছে। জার্মানির জাতীয় পর্যায়ের স্কুলশিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএসকে এই উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে; সংগঠনটি আগামী ২০ নভেম্বর আলাদা প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে।
বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শন বেকার রয়টার্সকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরতে তিনি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ভেতরে ঢুকে কক্ষগুলোতে প্রবেশ করলে মনে হয়, এটি যেন পরিত্যক্ত কোনো ভবন। অথচ আমাদের নিয়মিত এখানে এসে পড়াশোনা করতে হয়।’
জার্মান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে অনুষ্ঠিত শনিবারের বিক্ষোভগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে। একই দিন শনিবার ফ্রান্সেও যুব-নেতৃত্বাধীন গণবিক্ষোভে ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


