…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › লাইফস্টাইল › খবর
লাইফস্টাইল

মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া ৫০০ বছরের স্মৃতি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি মসজিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া ৫০০ বছরের স্মৃতি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি মসজিদ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলার ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে সুলতানি আমলের অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শন। কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মসজিদ, কোথাও আবার কালের সাক্ষী হয়ে টিকে রয়েছে ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ। তেমনই এক ঐতিহাসিক স্থাপনা চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি মসজিদ। আমবাগান, প্রাচীন দিঘি আর সবুজ গাছপালায় ঘেরা এই মসজিদ কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এর স্থাপত্য ও অতীতের গল্প ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় ছোট সোনা মসজিদ ও কোতোয়ালি দরজার মধ্যবর্তী এলাকায়, ওমরপুরের কাছে অবস্থিত দারাসবাড়ি মসজিদ। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছাকাছি এই স্থাপনা সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকেও বেশি দূরে নয়। মহানন্দা নদীর পাড়ঘেঁষা অঞ্চলে পৌঁছে আমবাগানের মধ্য দিয়ে এগোলে দেখা মেলে প্রাচীন মসজিদটির। কাছেই রয়েছে দারাসবাড়ি মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৪৭৯ সালে (হিজরি ৮৮৪) বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের শাসনামলে তাঁর নির্দেশে মসজিদটি নির্মিত হয়। একসময় এর নাম ছিল ফিরোজপুর জামে মসজিদ। মসজিদ থেকে পাওয়া আরবি শিলালিপি থেকে নির্মাণকাল ও শাসকের পরিচয় জানা যায়। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে মুনশী এলাহী বখ্শ এই শিলালিপি আবিষ্কার করেন; বর্তমানে শিলালিপিটি কলকাতার জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা যায়।

পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলে ‘দারুসবাড়ি’ নামে একটি শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। ১৫০২ সালে সুলতান হোসেন শাহের আমলে দারুসবাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তথ্যও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ধারণা করা হয়, শিক্ষাকেন্দ্রটির পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজপুর জামে মসজিদও দারাসবাড়ি মসজিদ নামে পরিচিতি পায়। আরবি ‘দরস’ শব্দের অর্থ পাঠ বা অধ্যয়ন—নামের সঙ্গে এই শিক্ষাকেন্দ্রের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ জেনারেল আলেকজান্ডার কানিংহামও এই স্থাপনাকে দারাসবাড়ি বা কলেজ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে মসজিদটির পাশাপাশি একসময় এখানে শিক্ষাচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

ইট দিয়ে নির্মিত দারাসবাড়ি মসজিদ একসময় আকারে ছোট সোনা মসজিদের চেয়েও বড় ছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। মসজিদের মূল ভবনের আয়তন প্রায় ৯৯ ফুট ৫ ইঞ্চি লম্বা ও ৩৪ ফুট ৯ ইঞ্চি চওড়া। পূর্ব দিকে ছিল একটি বারান্দা, যেখানে পাথরের স্তম্ভের ওপর ছোট-বড় একাধিক গম্বুজ ছিল। মূল ভবনের ওপরেও ছিল ৯টি গম্বুজ।

মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে পাশাপাশি ছিল নয়টি কারুকার্যখচিত মেহরাব। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ছিল জানালা। উত্তর-পশ্চিম কোণে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থাও ছিল। স্থাপত্যের এসব বৈশিষ্ট্য থেকে সুলতানি আমলের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর নির্মাণশৈলী সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তবে সময়ের সঙ্গে মসজিদটির অধিকাংশ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে চারপাশের দেয়ালের কিছু অংশ, পাথরের স্তম্ভের ভিত্তি এবং কয়েকটি মেহরাবের চিহ্ন অবশিষ্ট রয়েছে। দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল দারাসবাড়ি মসজিদ; পরে ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এটি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু উদ্ধার হওয়ার পরও সময়ের ক্ষয় ও পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে মসজিদটির অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।

বর্তমানে চারপাশে গাছগাছালি ও সবুজের আবরণে ঘেরা মসজিদটি অনেকটাই নির্জন। কাছেই রয়েছে দারাসবাড়ি মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ ও প্রাচীন দিঘি। সব মিলিয়ে পুরো এলাকাটি যেন অতীতের কোনো হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি বহন করছে।

দারাসবাড়ি মসজিদ দেখতে গেলে শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়, একই সঙ্গে বাংলার সুলতানি আমলের ইতিহাস ও স্থাপত্যের নানা চিহ্ন দেখার সুযোগ মিলবে। মসজিদের অবশিষ্ট মেহরাব, পাথরের স্তম্ভের ভিত্তি, পুরনো ইটের দেয়াল ও আশপাশের দিঘি ঘুরে দেখা যায়; সময় থাকলে কাছের ছোট সোনা মসজিদ ও কোতোয়ালি দরজাও ঘুরে আসা যায়। দারাসবাড়ি মসজিদ তাই কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

লাইফস্টাইল বিভাগের আরও খবর

বরফ নয়, সাদা পাথরের ধাপ: তুরস্কের ‘তুলোর দুর্গ’ পামুক্কালে যেভাবে ঘুরে দেখবেন
লাইফস্টাইল

বরফ নয়, সাদা পাথরের ধাপ: তুরস্কের ‘তুলোর দুর্গ’ পামুক্কালে যেভাবে ঘুরে দেখবেন

বরফের মতো সাদা পাহাড়ের ধাপ, তার মাঝে নীলাভ জল আর উষ্ণ প্রস্রবণ—দূর থেকে দেখলে মনে হবে রূপকথার কোনো রাজ্য। তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পামুক্কালে …