ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ-মালিক-শ্রমিক ঐক্যের আহ্বান শিমুল বিশ্বাসের

রাজধানী ঢাকার যানজট, সড়কের বিশৃঙ্খলা ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে পুলিশ, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও সাংবাদিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সংসদ সদস্য ও পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
তিনি বলেছেন, এই চার পক্ষের মধ্যে বন্ধুত্ব, ঐক্য ও সমন্বয় তৈরি হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে না। তাঁর ভাষায়, রাজধানী ঢাকাকে সুশৃঙ্খল করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আয়োজনে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে বাস পরিচালনার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ঢাকার বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থা, অসহনীয় যানজট এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাহীনতার অবসান সবাই চান। এ অবস্থা বদলাতে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। ঢাকায় প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষের বসবাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত বিপুল জনসংখ্যার নগরীতে সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি; কেউ কেউ এই সংখ্যা ২০ কোটি বলেও উল্লেখ করেন। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বিশৃঙ্খলা উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিবহন খাতে শৃঙ্খলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিআরটিএ, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও বিআরটিসিসহ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি চারটি পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে — পরিবহন শ্রমিক, মালিক, পুলিশ এবং সাংবাদিক। শ্রমিকদের দায়িত্বশীলতা, মালিকদের সহযোগিতা, পুলিশের বিশেষ করে ট্রাফিক বিভাগের কার্যকর ভূমিকা এবং সাংবাদিকদের গঠনমূলক সহযোগিতা থাকলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে তিনি বলেন।
বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রসঙ্গে শিমুল বিশ্বাস বলেন, বিদেশিরা বিমানবন্দর থেকে নেমে রাজধানীর সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলা দেখলে পুরো বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে যান। এই মন্তব্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, মালিক, শ্রমিক বা দলের বিরুদ্ধে নয়; বরং তা গোটা দেশের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে। ঢাকা সুশৃঙ্খল হলে সেই পরিবর্তনের প্রভাব দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে বলে তিনি বলেন।
তিনি বলেন, রাজধানীর সড়কে টেম্পো ও রিকশার ব্যাপক আধিপত্য যানজটের অন্যতম কারণ। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রয়োজনে এসব যানবাহনের গুরুত্ব থাকলেও এতে মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। যানজটে প্রতিদিন বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক অবদান রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের সমুদ্রসম্পদ, পাহাড়ের খনিজসম্পদ এবং বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বড় শক্তি। জাপানের মতো দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি হলেও বাংলাদেশে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত অনেক বেশি। এই জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিবহনসহ সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে হবে বলে তিনি বলেন।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতা এবং কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। জবাবদিহি ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, আজকের এই উদ্যোগ যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে কিংবা ফটোসেশনের পর বন্ধ হয়ে না যায়। এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে সবাইকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। পরিবহন খাতের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এই খাতের অনিয়ম, সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটির জন্য তিনি আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, পরিবহন খাত সচল থাকলে বাংলাদেশ সচল থাকে। বন্দর, নগর ও মানুষের জীবনযাত্রা সচল রাখতে পরিবহন খাতের অবদান অপরিসীম। তবে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এই খাতকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে; এসব সমালোচনা থেকে বেরিয়ে আসতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।



