নভি সাদ ট্র্যাজেডির দুই বছর: রেলস্টেশনের ছাদধস থেকে সরকার বদল, সার্বিয়ার ন্যায়ের লড়াইয়ের পথচলা
সার্বিয়ার নভি সাদ শহরে রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো রোববার। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বরের ওই দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন ধাপে ধাপে দেশজুড়ে রাজনৈতিক প্রচারে রূপ নেয় এবং গত সপ্তাহে সেই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ বিরোধী জোট ক্ষমতায় এসেছে।
২০২৪ সালের ১ নভেম্বর সংস্কার করা নভি সাদ রেলস্টেশন ভবনের কংক্রিটের ছাদ ধসে ঘটনাস্থলেই ১৪ জন নিহত হন এবং গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় তিনজনকে। আহতদের মধ্যে দুজন ওই বছরের নভেম্বরে ও ২০২৫ সালের মার্চে মারা গেলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ জনে। দুর্ঘটনাটি নির্মাণকাজের মান, সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে।
দুর্ঘটনার মাত্র চার দিন পর, ৫ নভেম্বর, হাজারো মানুষ নভি সাদে জড়ো হয়ে দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেন। বিক্ষোভ একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়; ডজনখানেক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সিটি হল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যবেক্ষকরা তখন লক্ষ করেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা দ্রুত এগোলেও দুর্ঘটনার তদন্ত এগোচ্ছিল ধীরগতিতে।
১৯ নভেম্বর বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, কাউন্সিলর ও নাগরিকেরা নভি সাদের আদালত ও প্রসিকিউটর কার্যালয়ের প্রবেশপথ টানা তিন দিন অবরোধ করে রাখেন। তাঁদের দাবি ছিল গ্রেপ্তারদের মুক্তি এবং ছাদধসের দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত। দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে প্রতিদিনই উত্তেজনা তৈরি হয় ওই অবরোধে।
জনচাপের তিন সপ্তাহ পর, ২১ নভেম্বর, নভি সাদের উচ্চ সরকারি প্রসিকিউটর কার্যালয় জানায়, স্টেশন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক নির্মাণমন্ত্রী গোরান ভেসিচসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর পরদিন থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত বেলগ্রেডের ইউনিভার্সিটি অব আর্টসের নাট্যকলা অনুষদের সামনে নিহতদের স্মরণসভায় ছাত্র ও অধ্যাপকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলাই মোড় ঘুরিয়ে দেয়: হামলাকারীদের বিচার, স্টেশন পুনর্নির্মাণের সব নথি প্রকাশ এবং আটক সব বিক্ষোভকারীর মুক্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
মাসের পর মাস চলা বিক্ষোভ ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধের চাপে ১১ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষ স্টেশন পুনর্নির্মাণের নথির একটি অংশ প্রকাশ করে। ১৯৫টি নথি সংবলিত আটটি বাইন্ডার উপস্থাপন করা হলেও শিক্ষার্থীরা তা অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা ও ঠিকাদার ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফৌজদারি জবাবদিহি দাবি করেন।
৩০ ডিসেম্বর নভি সাদের প্রসিকিউটররা জননিরাপত্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ, নির্মাণকাজে ত্রুটি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সন্দেহে ১৩ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দেন। তবে উচ্চ আদালত ভেসিচ এবং সার্বিয়া রেলওয়ে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ইয়েলেনা তানাসকোভিচের কারাগারে আটকের আদেশ বাতিল করে তাঁদের গৃহবন্দি করে; প্রসিকিউটর কার্যালয়গুলোর এখতিয়ার নিয়ে বিরোধ ও মামলার নথি স্থানান্তর নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি বেলগ্রেডের সংগঠিত অপরাধবিষয়ক প্রসিকিউটর কার্যালয় স্টেশন পুনর্নির্মাণে সম্ভাব্য আর্থিক জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে আলাদা তদন্ত শুরু করে, যাতে ভেসিচ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোমিস্লাভ মোমিরোভিচসহ নির্মাণ ও তদারকি কোম্পানির ব্যবস্থাপকদের মিলিয়ে ১২ জনের বেশি ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হন।
একই মাসে, ২৮ জানুয়ারি, নভি সাদে শাসক দলের কর্মীদের হামলায় কলা একাডেমির শিক্ষার্থীরা গুরুতর আহত হলে জনরোষ আরও বাড়ে। সার্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিলোশ ভুচেভিচ পদত্যাগ করেন — সেটি ছিল তখন পর্যন্ত সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ছাড়। তবু বিক্ষোভ ও অবরোধ থামেনি।
২০২৫ সালের ১১ মার্চ বেলগ্রেডে পরিকল্পিত বড় বিক্ষোভের আগের রাতে নভি সাদে ১৩ জন অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীকে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সহিংস আচরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। নাগরিক সংগঠনগুলো এসব গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা জানায়। ১৫ মার্চ বেলগ্রেডে কয়েক লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। ২৮ মে নভি সাদের উচ্চ আদালত কয়েকজন বন্দি অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীর কারাবাস গৃহবন্দিত্বে বদলে দেন, আর ২৫ জুন অভিযুক্ত কয়েকজন সার্বিয়া ছেড়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে চলে যান।
২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অক্টোবরে আগাম সংসদ নির্বাচনের ঘোষণার পর অনানুষ্ঠানিক ছাত্র আন্দোলনটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়: শিক্ষার্থী, অধ্যাপক ও আইন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হয় ‘স্টুডেন্ট লিস্ট—স্টুডেন্টস উইন’ জোট। ২৭ সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিনের নেতা আলেকসান্দার ভুচিচ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী তালিকার নেতৃত্ব নেন; প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দিনে তিনি বিচারের মুখোমুখি সব শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীকে ক্ষমা করে দেন, যাতে ‘সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ মামলাগুলো শেষ হয় এবং নির্বাসিত কর্মীরা নিরাপদে ফিরতে পারেন।
নির্বাচনে ভুচিচ স্টুডেন্ট লিস্টের কাছে পরাজয় স্বীকার করেন; ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফল ঘোষণার পরও নভি সাদ রেলস্টেশন ট্র্যাজেডির জবাবদিহির প্রশ্নটি সার্বিয়ার রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে আছে।




