২০২৭ সালের জনগণনা থেকে মণিপুরকে বাদ দিল ভারত, রাজ্যে সংঘাতের খবরও আসছে

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মণিপুরকে ২০২৭ সালের আসন্ন জনগণনার নির্ধারিত কার্যক্রম থেকে আপাতত বাদ দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, পরবর্তী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত মণিপুরে জনগণনা কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মেইতেই ও নাগা সম্প্রদায়ের একাধিক নাগরিক সংগঠন। তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, জনগণনার আগে নাগরিকত্ব যাচাই এবং এনআরসি নবীকরণ সম্পন্ন করতে হবে।
ওই সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, নাগরিকত্ব যাচাই না হলে মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীরাও জনসংখ্যার হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পারেন। এতে রাজ্যের প্রকৃত জনবিন্যাস, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সম্পদ বণ্টনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা বলেছে।
নির্বাচনী কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আন্দোলনরত সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, প্রথমে এনআরসি, পরে জনগণনা এবং তারপর ডিলিমিটেশন করতে হবে, কারণ নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া সংগৃহীত জনসংখ্যার তথ্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
মণিপুরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিংহ কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ মণিপুরের ভূমিপুত্র জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার প্রতি কেন্দ্রের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। ইউনাইটেড মেইতেই-পাঙ্গাল কমিটিও এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
তবে কুকি-জো কাউন্সিল জনগণনার আগে এনআরসি বাস্তবায়নের প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছে।
এদিকে মণিপুরে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে শনিবার একটি স্মারকলিপি দিয়েছে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল। সংগঠনটির অভিযোগ, সংঘর্ষবিরতি চুক্তির আওতায় থাকা কুকি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে এক ধরনের প্রক্সি যুদ্ধ চালানো হচ্ছে এবং এর শিকার হচ্ছে রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
স্মারকলিপিতে কুকি জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রের সংঘর্ষবিরতি চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, চুক্তির আওতায় থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হত্যা, তোলাবাজি, জমি দখল ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, মণিপুরের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে অবৈধ অভিবাসন, মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং কুকিদের তোলা পৃথক প্রশাসনের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। আসাম রাইফেলসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে সংগঠনটি সংঘাতপূর্ণ এলাকা ও সীমান্ত অঞ্চল থেকে ওই বাহিনী সরিয়ে অন্য নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে।
একই দাবিতে শনিবার ও রবিবার ইম্ফলে মেইতেই ও নাগা নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে বিশাল সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তার সমর্থনে মণিপুরের বিভিন্ন অংশে দোকানপাট, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থা বন্ধ ছিল এবং গণপরিবহণও রাস্তায় নামেনি। আয়োজকদের মতে, রাজ্যের ভূমিপুত্র সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঐক্য প্রদর্শনে এত বড় সমাবেশ আগে ঘটেনি।
এর মধ্যেই রবিবার মণিপুরের কাংপোকপি জেলার পার্বত্য অঞ্চলে দুটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ২৯ অক্টোবর থেকে এই জেলার দুই কুকি বাসিন্দা নিখোঁজ ছিলেন এবং তাদের সন্ধানে পুলিশ, সিআরপিএফ ও আসাম রাইফেলস অভিযান চালাচ্ছিল। তবে উদ্ধার হওয়া মরদেহ দুটি ওই দুই নিখোঁজ ব্যক্তির কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে মণিপুরের নোনে জেলায় নাগাদের আক্রমণে তিন কুকি যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে খবর এসেছে। ওই সংঘর্ষ নিয়ে পুলিশ সরকারিভাবে কিছু না বললেও নাগা ও কুকি-জো সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নুঙবা এলাকার তাইজেইকাইফুন গ্রামের কাছে নাগা ভিলেজ গার্ডস ও সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষে তিন কুকি গ্রামরক্ষী মারা যান, দুই কুকি নিখোঁজ হন এবং সংঘর্ষের পর তিনটি একে-সিরিজের রাইফেল ও অন্যান্য অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করা হয়।
কুকি ইনপি মণিপুর দাবি করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কুকি-জো গ্রামগুলোর জন্য সরকার পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের এলাকা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হয়েছে।




