কার্টেলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ‘এল টাইগ্রে’, পাশে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের ওয়াশিংটন

কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া কার্টেলের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধে কোনো ছাড় দিচ্ছেন না। ‘এল টাইগ্রে’ (বাঘ) ডাকনামে পরিচিত এই প্রেসিডেন্ট আইনশৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, আর ক্ষমতায় আসার পর থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তাঁর অভিযানের সুফল শুধু কলম্বিয়ায় নয়, ওয়াশিংটনেও মিলছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ভোররাতে বারানকিয়ার পুলিশ কমান্ডে হাজির হন তিনি, যখন ক্যারিবীয় বন্দরনগরী ও তার উপকণ্ঠের ৫০টি স্থানে ‘অপারেশন ব্লিন্দাহে ৩৬০’ নামে অভিযান চালাচ্ছিল ৫৮৭ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য। এর কয়েক দিন আগে কলম্বিয়ার পুলিশের হাতে ধরা পড়া একটি রেকর্ডিংয়ে ‘লস দেল ফ্রেসেও’ নামের একটি গ্যাংয়ের কথিত নেতা ‘কেকো’ দম্ভ করে বলছিলেন, দে লা এসপ্রিয়েয়ার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে কিছুই নেই। রেকর্ডিংয়ে কেকো বলেছিলেন, ‘বাঘের কাছে কিছুই নেই। সে বেরিয়ে আসুক, আমরা তাকে গুলি করে ভরিয়ে দেব।’
এর পর ভোর হওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট তাঁকে খুঁজে বের করে মুখোমুখি হন, আর পুরো ঘটনাটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, এল টাইগ্রে কেকোকে বলেন, ফোনে তিনি যতটা কড়া মেজাজের ছিলেন, তাঁর মুখের ভয়ের ছাপ তাঁর বহু ভুক্তভোগীর মুখের ভয়ের মতোই। এই ঝটিকা অভিযান শেষ হয় ৭২ জনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে।
ক্ষমতায় এসেই দে লা এসপ্রিয়েয়া তাঁর পূর্বসূরি বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ‘টোটাল পিস’ বা সর্বাত্মক শান্তি নীতি বাতিল করেছেন। ওই নীতিতে মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে আলোচনা ও শান্তি সংলাপের পথে হাঁটা হতো। সমালোচকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, এই নীতির কারণে কলম্বিয়া সংগঠিত অপরাধের কাছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল এবং ভেনেজুয়েলার কার্টেলগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়া জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ওই নীতির মূল উপাদানগুলো ভেঙে দেওয়া হবে এবং অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ফের সক্রিয় করা হবে। গত ২৫ আগস্ট তাঁর কট্টর ডানপন্থী সরকার ঘোষণা দেয়, গেরিলা যোদ্ধা, মাদক পাচারকারী ও অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হবে।
প্রায় তিন মাস ক্ষমতায় থাকা ৪৮ বছর বয়সী এই আইনজীবী দাবি করেছেন, তাঁর সময়ে ৩২ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। গত ১২ অক্টোবরের এক ভাষণে তিনি হিসাব দেন—মোট গ্রেপ্তার ৩২ হাজার ৫০৩ জন, ৩৩ জন গ্যাংপ্রধানকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে এবং ৬৭৯টি মাদক উৎপাদনকেন্দ্র ধ্বংস বা অকেজো করা হয়েছে। তিনি শতাধিক প্রত্যর্পণ আদেশে সই করেছেন, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ান্টেড সাবেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাঁচ শান্তি আলোচকও আছেন; আগের সরকার তাঁদের হস্তান্তর স্থগিত রেখেছিল।
গত মাসে তিনি নিজে হাতে-পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় এক গেরিলা নেতাকে ডিইএ (মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা) এজেন্টদের হাতে তুলে দেন। জিওভানি আন্দ্রেস রোহাস ওরফে ‘আরানিয়া’ নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘কমান্দোস দে লা ফ্রন্তেরা’ নামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন এবং মেক্সিকোর সিনালোয়া কার্টেলকে মাদক সরবরাহ করতেন। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে নারকো-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে।
৭ আগস্ট শপথ নেওয়ার পর সেনাদের উদ্দেশে দে লা এসপ্রিয়েয়া বলেছিলেন, ‘আলোচনার পথ সম্পূর্ণ শেষ।’ আগস্টেই কলম্বিয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব দি আমেরিকাস’ জোটের ১৯তম সদস্য হয়। মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, বোগোতা ‘সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংসে যৌথ সামরিক অভিযানের’ অনুমোদন দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন সাপেক্ষে ১০০ কোটি ডলার নিরাপত্তা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান মেরিন জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান কলম্বিয়ার ঘাঁটিগুলো ঘুরে দেখেছেন।
তবে কলম্বিয়ার উপ-রাষ্ট্রপতি হোসে মানুয়েল রেস্ত্রেপো ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর দেশ পশ্চিম গোলার্ধজুড়ে ট্রাম্পের নতুন নিরাপত্তা জোটের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কলম্বিয়ার ভেতরে অভিযান চালাবে কলম্বিয়ার সেনারাই, মার্কিন বাহিনী নয়।
এই আক্রমণাত্মক অভিযান দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা একলেডের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তারা কলম্বিয়ায় পর্যবেক্ষণ শুরু করার পর থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের দিক থেকে আগস্ট ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। আগস্টের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট ফার্ক বিদ্রোহী প্রধান ইভান মোরদিসকোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন তুমি সবচেয়ে কম প্রত্যাশা করবে, তখনই তোমার ওপর বোমা পড়বে।’ দুই দিন পর গুয়াভিয়ারেতে একটি সেনাঘাঁটিতে ২৩ সন্দেহভাজন বিদ্রোহীর মরদেহের সারির পাশ দিয়ে হেঁটে যান তিনি।
মিয়ামিতে বসবাস করা দ্বৈত মার্কিন-কলম্বিয়ান নাগরিক দে লা এসপ্রিয়েয়া কলম্বিয়াকে ট্রাম্পের কার্টেলবিরোধী জোটে নিয়ে এসেছেন। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের লাতিন আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক ও সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা বেঞ্জামিন গেদানের মতে, গত কয়েক বছর ছিল ব্যতিক্রম; কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়ার নিরাপত্তা সম্পর্কই ছিল স্বাভাবিক ধারা।



