এক পরিবারের লড়াইয়ে বিরল রোগের জিন থেরাপি: এলিজার জন্য তোলা অর্থে এফডিএর অনুমোদন পেল ফায়ুভি

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনার কলাম্বিয়ায় থাকা শিশুচিকিৎসক কারা ও’নিলের মেয়ে এলিজা ও’নিলের বয়স যখন তিন বছর, তখন তার বাবা-মা লক্ষ করেন, সে বিকাশের ধাপগুলোতে পিছিয়ে পড়ছে। তার ‘প্র্যাগম্যাটিক স্পিচ ডিলে’ ধরা পড়ে; সে অনেক শব্দ শিখলেও সামাজিক পরিস্থিতিতে সেগুলো স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করছিল না।
২০১৩ সালে কারার এক সহকর্মী একদল বিপাকজনিত রোগের পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন, শুধু সেগুলো বাদ দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরীক্ষায় এলিজার সানফিলিপো সিনড্রোম ধরা পড়ে। কারা বলেছেন, মেডিকেল স্কুলে পড়ার সময় এই বিরল বংশগত রোগটির কথা তাঁর মনে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘যখন তাঁরা শব্দটি বললেন, সবকিছু হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আর তখন শুধু আতঙ্কের একটা ভার নেমে এল; মনে হলো, হায়, এটা ভয়ংকর।’
সানফিলিপো আক্রান্ত শিশুদের একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকে, যার কারণে তারা হেপারিন সালফেট ভাঙতে পারে না; এই অণু কোষের স্বাভাবিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে এটি জমতে থাকলে গুরুতর জটিলতা দেখা দেয়।
ও’নিল পরিবারের প্রতিষ্ঠা করা ও এখনো পরিচালিত কিউর সানফিলিপো ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, সানফিলিপো আক্রান্ত শিশুরা কথা বলা ও হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাদের খিঁচুনি হয় এবং তারা সাধারণত কৈশোরের বেশি বাঁচে না।
এলিজার বাবা গ্লেন ও’নিল বলেছেন, পরীক্ষার ফল জানার পর বাড়ি ফিরে তিনি বুঝতে পারেন, অবনতি কত দ্রুত ঘটে। তিনি বলেন, ‘সেই মুহূর্তেই আমরা বললাম, যা করা দরকার, এখনই করতে হবে।’
ওহাইওর কলাম্বাসে নেশনওয়াইড চিলড্রেনস হাসপাতালে গবেষক হাইয়ান ফু ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ইঁদুরের ওপর সানফিলিপোর জিন থেরাপি নিয়ে কাজ করছিলেন। এই থেরাপিতে একটি পরিবর্তিত ভাইরাস ব্যবহার করে রোগীদের কোষে ত্রুটিপূর্ণ জিনের একটি কার্যকর অনুলিপি পৌঁছে দেওয়া হয়। ফু বলেছেন, পরীক্ষামূলক থেরাপিটি আশাব্যঞ্জক ছিল এবং ‘আগে চিকিৎসা করলে এটি সম্ভবত নিরাময় হতে পারে। তাই আমি হাল ছাড়তে পারি না।’
তবে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া ও অর্থ জোগাড় করা ছিল কঠিন। ২০০৯ সালে তিনি ছেড়ে দিতে হবে বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু সানফিলিপো আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলো তাঁকে থামায়। ফু স্মরণ করে বলেন, পরিবারগুলো বলেছিল, ‘আপনি যেতে পারবেন না। আমরা কি কিছু অর্থ দিতে পারি, যাতে আপনি কাজ চালিয়ে যেতে পারেন?’ আটটি রোগী ফাউন্ডেশন, যার মধ্যে বেনস ড্রিম ও আ কিউর ফর কার্বি রয়েছে, গবেষণা প্রথম মানব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত ফুর কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
কিন্তু একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যয়বহুল হতো। গ্লেন ও’নিল অর্থ তোলার একটি উপায় বের করেন। তিনি বলেছেন, তাঁরা ইন্টারনেটে পাওয়া অপরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন একটি ভাইরাল ভিডিও বানানোর জন্য; চলচ্চিত্র নির্মাতা বেঞ্জামিন ভন ওং ২০১৪ সালে কয়েক দিনে তাঁদের জন্য ভিডিওটি বানিয়ে দেন।
২০১৪ সালের বসন্তে ‘সেভিং এলিজা’ ভিডিওটি ও’নিল পরিবারকে সে সময়ের গোফান্ডমি রেকর্ড ভাঙতে সাহায্য করে; মাত্র কয়েক সপ্তাহে ১০ লাখ ডলার ওঠে। শিগগিরই তা ২০ লাখ ডলারে পৌঁছায়। সংগৃহীত অর্থ প্রথম মানব পরীক্ষার ব্যয় মেটাতে সাহায্য করে, যা শুরু হয় ২০১৬ সালের মে মাসে। এলিজাই ছিল সেই পরীক্ষায় জিন থেরাপি পাওয়া প্রথম রোগী; তখন তার বয়স ছিল ছয় বছর।
পরীক্ষাগুলো যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক হওয়ায় জৈবপ্রযুক্তি শিল্পের নজর পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে আলট্রাজেনিক্স নামের একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিন থেরাপিটির স্বত্ব কিনে নেয় এবং গবেষণা চালিয়ে যায়। কয়েক বছর পর প্রতিষ্ঠানটি পর্যালোচনার জন্য খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কাছে তথ্য জমা দেয়।
সেপ্টেম্বরে এফডিএ জিন থেরাপিটি অনুমোদন দেয়। একবারের এই ইনফিউশনটির নাম ফায়ুভি। আলট্রাজেনিক্সের প্রধান নির্বাহী এমিল কাকিস বলেছেন, ‘শিশু যত ছোট হবে, চিকিৎসা তত ভালো কাজ করবে, কারণ তত বেশি মস্তিষ্ক অবশিষ্ট থাকে।’ তিনি বলেন, ছয় মাস বয়সে চিকিৎসা পাওয়া কয়েকটি শিশু খুব ভালো করেছে।
ওষুধের দাম নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ৪৬ব্রুকলিনের তথ্য অনুযায়ী, আলট্রাজেনিক্স এই চিকিৎসার দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার নির্ধারণ করেছে, যা যৌথভাবে দ্বিতীয় সবচেয়ে ব্যয়বহুল জিন থেরাপি। কাকিস বলেছেন, দাম যা-ই হোক, প্রতিটি রোগী যেন চিকিৎসা পায়, তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এফডিএর অনুমোদনের ঘোষণার মুহূর্তখানেক পর ফু কারার ফোন পান; পাশাপাশি তাঁর গবেষণায় অর্থ দেওয়া অন্য পরিবারগুলোর বার্তাও পান। তাদের কয়েকজন এর মধ্যে সন্তান হারিয়েছেন। ফু বলেছেন, ফায়ুভির অনুমোদন ভালো খবর, তবে তাঁর জন্য তা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আসে: ‘এত সময় লাগা উচিত ছিল না।’
এলিজার বয়স এখন প্রায় ১৭ বছর। ছয় বছর বয়সে চিকিৎসা পাওয়ার আগেই সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল; তা আর ফিরে আসেনি, তবে সে ছবির কার্ড ও যন্ত্র দিয়ে যোগাযোগ করতে পারে। এলিজা স্কুলে যায়। এই গ্রীষ্মে সে সাঁতার কেটেছে এবং পুল নুডলে ভাসতে শিখেছে। গ্লেন বলেন, ‘আমি শুধু আমার মেয়েকে নিয়ে গর্ব অনুভব করি। তার জন্য পথটা কঠিন গেছে, তবে আমরা জানি সে খুব ভাগ্যবতীও।’



