শর্ত পূরণ হলে দুই দিনেই হরমুজ আংশিক খুলতে পারে ইরান, ট্রাম্প বললেন আলোচনা ‘ভালোই চলছে’
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলমান যোগাযোগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি সম্ভাবনা তৈরি হলেও দুই পক্ষই নতুন করে সামরিক উত্তেজনার প্রস্তুতির কথা বলছে।
কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দিনের আলোচনার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের দাবি বাস্তবে কার্যকর করা হলে একটি চুক্তি সম্ভব। একই সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য মনে হলে হামলা সম্প্রসারণ কিংবা আগাম হামলার প্রস্তুতির কথাও তারা জোর দিয়ে বলেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। আমরা আমাদের অস্ত্রশস্ত্র আধুনিক করেছি, দুর্বলতা দূর করেছি এবং নতুন অস্ত্র পরীক্ষা করেছি। আমাদের বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতির স্তরে রয়েছে।’
আরাঘচির মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেন, আলোচনা ‘ভালোই চলছে’, তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘নির্ভরযোগ্য নয়’।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলার নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবার দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার সম্ভাবনা বারবার তুলেছেন। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো ক্লাবে হ্যালোইন পার্টিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু স্থাপনায় আরও বোমা হামলার প্রসঙ্গে ‘আমাদের এখনো এক-দুটি স্থাপনার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে তা আমরা ১০ মিনিটেই করতে পারি।’
শুক্রবার তেহরানে এবং শনিবার কাতারে মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় একটি নতুন বাস্তব ফল এসেছে বলে মনে হচ্ছে: হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার ইরানি প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার সময়সীমা কমেছে। তেহরান আগে সাত দিনের কথা বলেছিল, এখন তা দুই দিনে নেমে এসেছে বলে আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে জানান আরাঘচি।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনা এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক যোগাযোগের মধ্যে আলোচিত সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের ‘ইঙ্গিত’ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তবে ইরান একাধিক ছাড় চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দেওয়ার আগে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে অগ্রগতি চায়। ফলে মূল জটিলতা হলো ধারাবাহিকতা ও প্রভাব—প্রতিটি পক্ষই চায় অন্য পক্ষ আগে পদক্ষেপ নিক।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, আরাঘচির দুই দিনের প্রস্তাব ধারাবাহিকতার প্রশ্নে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়, যা মৌলিক মতপার্থক্য অবিলম্বে না মিটিয়েও দুই পক্ষকে প্রাথমিক কূটনৈতিক অর্জন দাবি করার সুযোগ দিতে পারে। তবে সামরিক বক্তব্য এই সুযোগের সীমাও দেখিয়ে দেয় বলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন।
শনিবার আলোচনা চলার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির দপ্তর জানায়, শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে আগের এক বৈঠকে তিনি যেকোনো হুমকির ‘ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া’ তাৎক্ষণিক জবাবের প্রস্তুতির মাধ্যমে ‘সর্বোচ্চ প্রতিরোধ’ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। খামেনি বলেন, লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘বাস্তব ও অবাস্তব’ সম্পদ।
খামেনির বক্তব্যের পর সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা আলাদাভাবে সংঘাত বাড়লে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য হামলা চালানোর প্রস্তুতির কথা জানান। রবিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বিশাল সংরক্ষণাগার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বের করে মোতায়েনের ফুটেজও দেখানো হয়।
কর্তৃপক্ষ আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিডসহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছ থেকে আরও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা করছে তারা। ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর প্যাসিভ ডিফেন্সের কমান্ডার গোলামরেজা জালালি রবিবার বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে সহায়তা প্রয়োজন হবে এমন বিদ্যুতের ওপর সবচেয়ে নির্ভরশীল ১৪টি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে ইরানি কর্তৃপক্ষের গঠিত পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে অস্বীকার করা জাহাজগুলোতে হামলা অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার ও শনিবার অন্তত চারটি ট্যাংকারে আঘাতের খবর চিহ্নিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায়, শনিবার ইরানের লাভান দ্বীপের প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল (৭৪ কিলোমিটার) দক্ষিণে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বহনকারী একটি জাহাজে তিনটি ইরানি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে।
ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই শনিবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্তের দিকে পদক্ষেপ না নিলে প্রণালি ও আশপাশের জলপথে চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। তেহরানের শর্তের মধ্যে রয়েছে: তেল রপ্তানি ও ইরানের বেশির ভাগ বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া, বিদেশে আটক ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, লেবাননসহ সব আঞ্চলিক ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার স্বীকৃতি।
রেজাই বলেন, ভ্যান্সের পক্ষ থেকে তাঁকে পাঠানো একটি চিঠির জবাব তিনি এখনো দেননি, তবে চিঠিটিতে ‘সুরের পরিবর্তনের’ ইঙ্গিত ছিল, যাকে তিনি ‘ইতিবাচক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও স্থল বাণিজ্য ও বিমান চলাচলের ওপর চাপ নিয়ে গড়া ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর কার্যকারিতার কথা জোর দিয়ে বলছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তৈরি মার্কিন ট্রেজারির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ আগস্টের পর থেকে ইরানের টার্মিনালগুলোতে কোনো নতুন তেল ট্যাংকারে তোলা হয়নি, বিদেশে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ কমেছে, সেপ্টেম্বরে বছরে বছরে মুদ্রাস্ফীতি ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং জাতীয় মুদ্রা দুর্বল হচ্ছে। প্রতিবেদনে সম্মিলিত পদক্ষেপে ইরানের অর্থনীতি ‘পঙ্গু’ হয়েছে বলা হলেও তা ধসের কাছাকাছি বলে যুক্তি দেওয়া হয়নি।



