জ্বালানি সংকট আর কাঁচামালের দামে চাপে দেশের রেস্তোরাঁ ব্যবসা, বাড়ছে পরিচালন ব্যয়
নগরায়ণ, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন আর বাইরে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে রেস্তোরাঁ ব্যবসা সম্প্রসারিত হচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত গড়ে উঠছে নানা ধরনের খাবারের দোকান, ফাস্টফুড আউটলেট, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ। তরুণ উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এই খাতে বিনিয়োগ করছে।
তবে ব্যবসার পরিধি বাড়লেও পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতা এবং ভোক্তার ব্যয় সংকোচনের কারণে চাপে রয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২১ সালের হোটেল ও রেস্তোরাঁ জরিপ অনুযায়ী, দেশে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭৪টি। এক দশকে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ। জরিপে চায়ের দোকানের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুডের দোকান ও অন্যান্য খাবারের প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে ২০২১ সালের পর একই ধরনের পূর্ণাঙ্গ জরিপ প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে ওই পরিসংখ্যানকে বর্তমান বাজারের চিত্র হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসার সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। রেস্তোরাঁ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মাংস, মাছ, চাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে খাবার তৈরির খরচও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মীদের বেতন, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও এলপিজির ব্যয়।
ফলে একদিকে খাবারের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা এবং ক্রেতাদের ব্যয় কমে যাওয়াকে এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি রেস্তোরাঁ চালু করতে উদ্যোক্তাদের একাধিক সরকারি সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ও বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়। একই সঙ্গে এলপিজি সরবরাহ, নতুন গ্যাস সংযোগ এবং কর-ভ্যাটের বিষয়গুলোও ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায় প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে একই এলাকায় একাধিক রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠায় ক্রেতা আকর্ষণে খাবারের মান, স্বাদ, পরিবেশ, মূল্য ও সেবার ওপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। অনলাইন অর্ডার ও খাবার সরবরাহের সুযোগ ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন এনেছে। তবে এসব সেবার সঙ্গে যুক্ত কমিশন ও সরবরাহ খরচ ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এই খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। খাবার সংরক্ষণ, রান্না, পরিবেশন এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করলে ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে রেস্তোরাঁগুলোতে নিয়মিত তদারকি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ ব্যবসা সম্ভাবনাময় হলেও এই খাতের টেকসই বিকাশে উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় কমানো, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা তদারকি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতিমালা তৈরি করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের সেবা খাতের বিকাশে রেস্তোরাঁ শিল্প আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।


