লেবাননে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দামে আরও কোণঠাসা ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা
লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ত্রিপোলির বেদ্দাউই শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা ফিলিস্তিনি শরণার্থী ওসামা নাজ্জারের একসময় অ্যালুমিনিয়াম বিক্রির একটি দোকান ছিল। লেবাননে ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা, আইন, প্রকৌশল ও ফার্মেসিসহ নির্দিষ্ট কিছু পেশায় কাজ করা নিষিদ্ধ, তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা যাই হোক, অনেকের কাছেই দোকানের মতো নিজের ব্যবসা অর্থনৈতিক জীবনরেখা।
কিন্তু নাজ্জার জানান, পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। ব্যবসা মন্দা আর বিল মেটাতে না পেরে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দোকানটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি। তারপর থেকে কাজ পাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
উচ্চ মূল্য ও বেড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ বিলকে সাম্প্রতিক দুশ্চিন্তা হিসেবে উল্লেখ করে নাজ্জার বলেন, শিবিরগুলোতে ফিলিস্তিনিদের সামগ্রিক পরিস্থিতি মর্মান্তিক।
ফিলিস্তিনিরা লেবাননে শরণার্থী হয়েছিলেন ১৯৪৮ সালের নাকবার সময়, যখন জায়নবাদী বাহিনী ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। সেই প্রক্রিয়ায় ৫০০-র বেশি ফিলিস্তিনি শহর ধ্বংস করা হয়, প্রায় ১৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ শরণার্থী হয়ে পশ্চিম তীর ও প্রতিবেশী দেশগুলোর শিবিরে পালিয়ে যান।
তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ মানুষ উত্তরে লেবাননে যান। অনেকে ভেবেছিলেন একদিন বাড়ি ফিরবেন। প্রথমে তারা অনানুষ্ঠানিক বসতি ও তাঁবুতে থাকলেও বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁবুর জায়গায় অনানুষ্ঠানিক ও প্রায়ই অনিয়ন্ত্রিত কংক্রিটের কাঠামো গড়ে ওঠে।
১৯৬৪ সালে লেবানন বিদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে একটি ডিক্রি জারি করে, যাতে অ-লেবাননিদের কাজের অনুমতিপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে নানা ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠী যুদ্ধে অংশ নেয়; সেই উত্তরাধিকার লেবাননের জনগণের একাংশের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিরূপ মনোভাব রেখে গেছে।
২০১০ সালে লেবাননের শ্রম আইনে সংশোধনী এনে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের জন্য কিছু অনুমতিপত্রের ফি কমানো ও অন্যান্য বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এর বাস্তবায়ন ছিল সীমিত। ২০২১ সালে শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি ডিক্রিতে কিছু পেশায় বিধিনিষেধ শিথিলের কথা বলা হলেও তা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেবানন সরকার একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করে, যাতে ফিলিস্তিনি নার্সিং শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব আইনি পরিবর্তনের অনেকগুলোই লেবাননের শ্রমশক্তি থেকে ফিলিস্তিনিদের কাঠামোগত বঞ্চনার চিত্র বদলায়নি।
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ লেবাননে ১২টি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরকে স্বীকৃতি দেয়। সংস্থাটির লেবানন কার্যালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ফিলিস্তিনি বসবাস করছিলেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফিলিস্তিনি-লেবাননি গবেষক ও পডকাস্টার এলিয়া আইয়ুব বলেন, লেবাননে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আচরণ খুবই আলাদা ও বৈষম্যমূলক। তিনি উল্লেখ করেন, ফিলিস্তিনিরা অনেক শীর্ষ পেশার জন্য পড়াশোনা করতে পারলেও সেসব পেশায় কাজ করতে পারেন না, তারা জমির মালিক হতে পারেন না এবং দেশটির সংসদে তাদের কোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নেই। তার ভাষায়, লেবাননে একটি জাতি-সম্প্রদায়ভিত্তিক ব্যবস্থা থাকলেও ফিলিস্তিনিরা তার একটি হিসেবে স্বীকৃত নন।
দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফিলিস্তিনিদের অবস্থা বিশেষভাবে তীব্র হয়ে উঠেছে। লেবানন এখনো ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সংকট থেকে সেরে ওঠেনি। তবে জ্বালানির বাড়তি খরচ ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ফিলিস্তিনিদের বিশেষভাবে আঘাত করেছে।
লেবানন রাষ্ট্র দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, ফলে অধিকাংশ বাসিন্দাকে বেসরকারি জেনারেটর বা বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এদিকে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০২৬ সালে লেবাননের মূল্যস্ফীতি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই কঠিন সময়ে অনেক ফিলিস্তিনি সহায়তার জন্য ইউএনআরডব্লিউএর দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় সংস্থাটির কর্মীরা অংশ নিয়েছিলেন — প্রমাণ ছাড়াই ইসরায়েলের এই অভিযোগের পর ২০২৪ সালে অনেক দেশ সংস্থাটিতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। ইউএনআরডব্লিউএ অভিযোগটি জোর দিয়ে অস্বীকার করে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে অনেক রাষ্ট্র আবার অর্থায়ন চালু করে। তবু গত জুলাইয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রায় ১০ কোটি ডলারের তহবিল ঘাটতির বিষয়ে সতর্ক করেন। সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি জানায়, ২০২৬ সালের শেষ থেকে ২০২৭ সালের শুরুর মধ্যে তাদের অন্তত ২০ কোটি ডলারের আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘরে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ না থাকায় অনেক ফিলিস্তিনি সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টায় জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। ২০২২ সালে লেবানন থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা সিরিয়া উপকূলে ডুবে গেলে অন্তত ৮৬ জন মারা যান; নিহতদের অনেকেই ছিলেন শিবিরের ফিলিস্তিনি। ফ্রিডরিখ নাউমান ফাউন্ডেশনের হিসাবে, লেবানন উপকূল থেকে ছাড়া নৌকার সংখ্যা ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয় এবং পরের বছর আরও ১২১ শতাংশ বাড়ে।
জীবনযাত্রার ব্যয় লেবানন উপকূলে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে ওঠায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, আরও বেশি ফিলিস্তিনি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আগের চেয়ে ঘন ঘন সমুদ্রে নামতে শুরু করতে পারে। অক্টোবরের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন লেবাননের জন্য একটি সহায়তা মিশন অনুমোদন করে, যার লক্ষ্য সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহায়তাসহ দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে শক্তিশালী করা।



