মজুরি বোর্ড গঠনের পরও থামেনি পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শ্রমিক সুরক্ষা ও রপ্তানি সচল রাখার তাগিদ
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরে দিনভর বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। আন্দোলনের মুখে আশুলিয়া ও গাজীপুরে ২৭৭টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। একই দিন সরকার ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও বিক্ষোভ থামেনি।
শ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্ধারণ করা হয় এবং ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। পাশাপাশি বকেয়া বেতন পরিশোধ, যথেচ্ছ ছাঁটাই বন্ধ, কালো তালিকাভুক্তির চর্চা বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে।
রোববার সকালে মিরপুর-১০ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। পরে মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। পরে দুপুরের দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সাভারের আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম, টাউজার লাইন ও নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়কে অবস্থান নেন এবং অন্য কারখানার শ্রমিকেরাও আন্দোলনে যোগ দেন। দুপুর ১২টার দিকে নরসিংহপুরে অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। বিকেল পাঁচটার দিকে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
গাজীপুরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সকাল থেকে আন্দোলন করেন শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে সড়কে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন দেওয়া হয়। যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। নিরাপত্তার কারণে গাজীপুরে ১০০টি কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এর আগের দিন ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রথম দিন আশুলিয়া ও গাজীপুরে প্রায় ৫০টি কারখানা এবং মিরপুরের প্রায় সব পোশাক কারখানায় কাজ বন্ধ ছিল। আশুলিয়ায় সংঘর্ষে ছয় পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন। গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রায় তিন ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা।
অক্টোবরের শুরুতে গাজীপুরে শ্রমিক সমাবেশ থেকে প্রথম ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানানো হয়। ১ ডিসেম্বরের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন করতে বলা হয়, না হলে দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। ১৪ ও ১৫ অক্টোবর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। তখন শ্রম অধিদপ্তর মজুরি বোর্ডের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছে চিঠি পাঠায়।
শ্রম আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় বর্তমান মজুরিতে পরিবার নিয়ে শহরে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে।
৩১ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রাজধানীর বিজয়নগরের শ্রম ভবনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি জানান, রোববার মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে নিয়মিত বেতন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় ১ নভেম্বর পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিচারপতি শেখ আসফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রাখা হয়েছে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিনকে। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। এ ছাড়া নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধান অনুসারে এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
রোববার রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মজুরি বোর্ডকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি শ্রম মন্ত্রণালয়কে শ্রমিকদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায়। তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। সহিংসতা নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোলা রয়েছে বলেও তিনি বলেন। আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়িতে আগুন, হামলা, যানবাহন ভাঙচুর এবং কারখানায় অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, সরকার তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন শ্রমিকদেরও কাজে ফিরে যাওয়া উচিত। সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি মজুরি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে তিনি জানান। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিনও আন্দোলনকে সমর্থন করেন না বলে জানিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সহসভাপতি জলি তালুকদার মনে করেন, সরকারের সময়ক্ষেপণ শ্রমিকদের অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
বোর্ড গঠন মানেই মজুরি বৃদ্ধি নয়। নতুন মজুরি কত হবে, তা নির্ধারণের জন্য মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের আলোচনা এবং বোর্ডের সুপারিশ প্রয়োজন। এরপর সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন মজুরি কার্যকর হবে।



