গঠিত হলো ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড, নতুন মজুরি চূড়ান্ত হতে কত দিন লাগতে পারে

শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে সরকার তড়িঘড়ি করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এই বোর্ড আলাপ-আলোচনা করে একটা খসড়া মজুরি কাঠামো শ্রম মন্ত্রণালয়কে পাঠাবে। তারপর তা চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে সেই অনুযায়ী বাড়তি মজুরি পাবেন পোশাকশ্রমিকেরা।
রোববার শ্রম মন্ত্রণালয় দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করার পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পের নিম্নতম মজুরি বোর্ডের জন্য মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছে। ছয় সদস্যের বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। একটি প্রজ্ঞাপনে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্য করা হয়েছে।
আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিজিএমইএ পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন। আর শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
প্রজ্ঞাপনে কত দিনের মধ্যে মজুরি আলোচনা শেষ করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া নেই। তবে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কোনো শিল্প খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকার থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করার বিধান রয়েছে। তবে বোর্ডের অনুরোধে সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করার পর বোর্ডের চেয়ারম্যান সভা আহ্বান করেন। সভায় চেয়ারম্যান শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মজুরি প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুরোধ করেন। প্রস্তাব জমা হওয়ার পর বোর্ডের সদস্যরা আলোচনা করেন। অনেক সময় মজুরি বোর্ডের সদস্যরা প্রয়োজন মনে করলে এক বা একাধিক শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করেন। বোর্ডে আলোচনায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত হয়। সেই খসড়ার ওপর আপত্তি বা সুপারিশ নেওয়া হয়। তারপর চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠায় নিম্নতম মজুরি বোর্ড।
তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ নিম্নতম মজুরি বোর্ড হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর মজুরি কাঠামো কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। ২০২৩ সালের মজুরি বোর্ড ছয়টি সভা করে ওই বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরির সুপারিশ করেছিল। এরপর ডিসেম্বরে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
শ্রম আইন ও গত মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নবগঠিত মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম আগামী বছরের এপ্রিলে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়কাল পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করেছে।
পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। তবে শ্রম আইন সংশোধন হওয়ার পর নাকি আগে থেকে তিন বছরের সময় গণনা করা হবে, তা নিয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের ভিন্নমত ছিল। যদিও শ্রমিক আন্দোলনের মুখে সেই ভিন্নমত টেকেনি।
শ্রমিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, চলতি বছর ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করতে হলে গত মে মাসেই মজুরি বোর্ড গঠন করা দরকার ছিল। সেটি না হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। বোর্ড গঠনে দেরি হলেও আগামী মাসের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নতুন মজুরি কাঠামো কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আইন ও বিধিমালায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। ফলে কবে নতুন মজুরি কাঠামো দেবে, সেটি বোর্ডের সিদ্ধান্ত। তবে সেটি বাস্তবায়নে আমাদের সময় দিতে হবে। আইন অনুযায়ী আরও দুই বছর পর নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল আমাদের। তবে বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকদের জীবন চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এটি সত্য। একই সঙ্গে শিল্পের সক্ষমতা ও মালিকদের সঙ্গে দরকষাকষির জন্যও সময় দরকার।’
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৯৯৪ সালে প্রথমবার নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। সেই বোর্ড ৯৩০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে। ২০০৬ সালে সেটি বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। ২০১০ সালের মজুরি বোর্ডে শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি ৩ হাজার টাকা করা হয়। ২০১৩ সালের মজুরি বোর্ড ৫ হাজার ৩০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ড পোশাকশ্রমিকদের জন্য ৮ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি চূড়ান্ত করে, যার মধ্যে মূল মজুরি ৪ হাজার ১০০ টাকা।
জানতে চাইলে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ‘মজুরি বোর্ড গঠন করতে সরকারের বিলম্ব হয়েছে। সে জন্য শ্রমিকদের একটি অংশ আন্দোলনে নেমেছেন। এখন আমাদের চাওয়া, যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা করে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হোক।’



