ঢাকায় আজিমপুর কলোনি থেকে এক দিনের নোটিশে বাসাছাড়া ঢাবি ছাত্রী, কাল থেকে সেমিস্টার ফাইনাল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পরিবেশনা কলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনিয়া আক্তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে আসন না পেয়ে প্রায় দুই বছর ধরে রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনিতে সাবলেট থাকতেন। সরকারি আবাসন থেকে সাবলেট ও ভাড়াটেদের সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশের পর হঠাৎ তাঁকে বাসা ছাড়তে হয়েছে, অথচ আগামীকাল থেকে তাঁর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা।
গত বৃহস্পতিবার নাটকের মহড়ায় থাকা অবস্থায় আনিয়াকে জানানো হয়, ভাড়াটেদের বাসা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। পরদিন শুক্রবার রাতে বরাদ্দপ্রাপ্ত বাড়িওয়ালা তাঁকে জানান, ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই বাসা ছাড়তে হবে।
আনিয়া বলেন, ‘২ নভেম্বর (সোমবার) থেকে আমার সেমিস্টার ফাইনাল। জিনিসপত্র গোছাব কখন, যাব কীভাবে, কোথায় যাব? এসব বলার পর বাড়িওয়ালার স্ত্রী বলেন, কিছু করার নেই। যদি ধরা পড়ে যাই, আমাদের বাসা বাতিল হতে পারে, আমার স্বামীর চাকরি নিয়ে সমস্যা হতে পারে।’
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবরের পর সরকারি ফ্ল্যাটে সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরিজীবীর বাসা বরাদ্দ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গতকাল শনিবার আজিমপুর সরকারি কলোনিতে সাবলেটে থাকা শিক্ষার্থীদের বাসা ছাড়তে দেখা যায়।
আনিয়া জানান, মাসের শুরুতেই তিনি বাসাভাড়া অগ্রিম দিয়েছিলেন, অথচ বাসা ছাড়ার জন্য কার্যত এক দিনের সময় পেয়েছেন। পরিবেশনা কলার শিক্ষার্থী হওয়ায় নাটকের কাজের বিভিন্ন সরঞ্জামও তাঁকে সরাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ট্রাক ম্যানেজ করিনি। জানি না কীভাবে কী করতে হয়। সারা রাত তিন-চারটা অ্যাপে চেষ্টা করেও ট্রাক পাইনি।’ শনিবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে বসে থাকলেও সেগুলো কোথায় নেবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি তাঁর।
শেষ পর্যন্ত তাঁর জিনিসপত্র এক বন্ধুর বাসায় রেখেছেন এবং নিজে উঠেছেন মোহাম্মদপুরে এক আত্মীয়ের বাসায়। জিনিসপত্র স্থানান্তরে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে এবং নিজে উপার্জন না করায় পরিবারের ওপরও আর্থিক চাপ পড়েছে বলে তিনি জানান।
আনিয়ার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন পরীক্ষা নিয়ে। আগামীকাল থেকে শুরু হয়ে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর টানা ব্যস্ত সূচি রয়েছে। এই সময়ে নতুন বাসা খোঁজা, বাসা বদলানো ও পড়াশোনা একসঙ্গে সামলানো কঠিন বলে তিনি জানান।
আত্মীয়ের বাসায় তিনি যে ডাইনিংরুমে উঠেছেন, সেখানে আলো ও পাখার ব্যবস্থা নেই এবং ঘরটি পরিষ্কার করতে তাঁকে সারা রাত ব্যয় করতে হয়েছে। শিশুসহ সেই পরিবারের পাঁচজন সদস্য ওই বাসায় থাকেন, ফলে নিজের মতো পড়াশোনার পরিবেশ তৈরির সুযোগ নেই।
আনিয়া বলেন, ‘আগামীকাল পরীক্ষা, এখন বাসা খুঁজব নাকি পরীক্ষার পড়া পড়ব?’ বন্ধুর বাসায় ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারবেন কি না জানতে চাইলেও বন্ধুর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা থাকায় সেখানেও দীর্ঘদিন থাকার নিশ্চয়তা নেই বলে তিনি জানান।
আজিমপুর কলোনিতে থাকার বড় সুবিধা ছিল নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থান। আনিয়ার নাটকের মহড়া অনেক সময় রাত ১২টা পর্যন্ত চলে। তিনি বলেন, ‘রাত ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোহাম্মদপুরে আসা একজন নারীর জন্য কতটুকু নিরাপদ, এটাও তো বুঝতে হবে।’
তাঁর হিসাব অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর থেকে প্রতিদিন রিকশায় যাতায়াতেই প্রায় ৪০০ টাকা খরচ হয়, এর সঙ্গে খাবারের ব্যয়ও রয়েছে। ছাত্রী হোস্টেলের বিকল্প ভাবলেও এক কক্ষে তিন-চারটি বিছানার ব্যবস্থায় শুধু থাকার জন্য মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করা তাঁর পক্ষে কঠিন বলে তিনি জানান।
এদিকে আজিমপুরের ছাত্রী হোস্টেলগুলোতে আবার আসন খুঁজতে শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। ‘মুগ্ধ ছাত্রী হোস্টেল’ নামে পরিচিত একটি হোস্টেলের পরিচালক মুক্তা বলেন, গত ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী কলোনি পরিদর্শনের পর থেকেই মৌখিক নোটিশ আসতে শুরু করে এবং গত বৃহস্পতিবার সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পর ছাত্রীরা হোস্টেলে আসন খুঁজতে শুরু করেন।
মুক্তা জানান, ছাত্রীরা কলোনিতে চলে যাওয়ায় হোস্টেল ব্যবসা সংকুচিত করতে হয়েছে — আগে ২৫টি ভবনে কার্যক্রম থাকলেও এখন তা ১০টি ফ্ল্যাটে এসে ঠেকেছে, প্রায় ৫০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে এবং কর্মী ৪৫ জন থেকে কমে তিনজনে নেমেছে। এখন শিক্ষার্থীরা ফিরতে শুরু করায় তাঁর হোস্টেলে দুই, তিন ও চার আসনের কক্ষে প্রতি আসনের ভাড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে আসনের ব্যবস্থা রয়েছে বলে তিনি জানান।




