দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ এজেন্ডায় রাখতেই ‘তীব্র আপত্তি’ ছিল ব্রিটেনের, কমনওয়েলথ সম্মেলনের আগে জানালেন গনসালভেস

অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলন (চগম) শুরু হওয়ার আগে দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ নিয়ে কাঠামোগত সংলাপে বসতে রাজি হয়েছে ব্রিটেন। তবে ক্যারিবীয় রাজনীতিক রালফ গনসালভেস বলেছেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা প্রথমে জোর দিয়ে বলেছিলেন, দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণের আলোচনা সম্মেলনের এজেন্ডায় থাকা উচিত নয়।
সেন্ট ভিনসেন্ট ও দ্য গ্রেনাডিনসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষতিপূরণ ন্যায় আন্দোলন ‘রিপেয়ার ক্যাম্পেইন’-এর জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব রালফ গনসালভেস বলেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন যে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ডায় থাকলে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বৈঠকে যোগ নাও দিতে পারেন।
গনসালভেস ব্রিটেনের কাঠামোগত সংলাপে বসার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, ব্রিটেন ‘লাথি খেয়ে ও চিৎকার করতে করতে’ এই আলোচনার টেবিলে এসেছে। তাঁর ভাষায়, অন্তত তারা আসছে—এটাই অগ্রগতি।
বর্তমানে দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ আনুষ্ঠানিকভাবে চগম সম্মেলনের এজেন্ডায় নেই। আফ্রিকা, এশিয়া, ক্যারিবীয় ও আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত ৫৬ জাতির এই জোটের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও অর্থায়ন, টেকসই ঋণ, গণতন্ত্র এবং তরুণদের সুযোগে বিনিয়োগ।
গনসালভেস বলেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কানাডীয় কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীর না-যাওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ব্রিটিশ পক্ষ এমন ‘অসত্য’ও ছড়িয়েছিল যে ভারত বিষয়টি এজেন্ডায় চায় না; অথচ ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে ভারত খুবই সমর্থন জানিয়েছিল।
ক্যারিবীয় দেশগুলোর নিরলস প্রচার এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষতিপূরণ আন্দোলন বিষয়টিকে সম্মেলনের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ঠেলে দিয়েছে বলে গনসালভেস বলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভেতরে, লেবার পার্টির ভেতরে, হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডসেও এ নিয়ে কাজ চলছে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন একটি বিষয়, যা আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
গনসালভেস বলেন, চগম সম্মেলনেই কাঠামোগত সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে নেতারা যখন ব্যক্তিগত ‘রিট্রিট’ বৈঠকে বসবেন, তখন সংলাপের ধরন ও বিস্তারিত বিষয় আলোচনা হওয়ার আশা করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক এজেন্ডায় না থাকলেও সম্মেলনের আলোচনায় ও রিট্রিটে বিষয়টি উঠবেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ক্যারিবীয় কমিউনিটি (ক্যারিকম) রেপারেশনস কমিশনের চেয়ার অধ্যাপক স্যার হিলারি বেকলস এই বৈঠককে ‘ক্ষতিপূরণের চগম’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়ই ‘এক নম্বর বিষয়’।
শুক্রবার ব্রিটেনের অবস্থানে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে আরও এগিয়ে কাঠামোগত সংলাপে রাজি হন এবং ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানান। দ্য গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে তিনি এই ঘোষণা দেন। ক্যারিবীয় সরকার ও প্রচারকারীরা বার্নহামের ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, ক্ষতিপূরণের ধরন নিয়ে একমত হওয়া এখনো অঞ্চলটির অগ্রাধিকার।
গায়ানার প্রেসিডেন্ট ইরফান আলি বার্নহামের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে আগামী ৬ থেকে ১২ মাসে সংলাপের বিস্তারিত ঠিক করতে একটি কমনওয়েলথ উপকমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনা দাসপ্রথার অপমানের মূল্য নির্ধারণের চেষ্টার বাইরে গিয়ে এর উন্নয়নগত পরিণতি মোকাবিলায় যেতে হবে—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সেবা ও অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘাটতি চিহ্নিত করে যুক্তরাজ্য সরকার ও তার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে পথ খুঁজতে পারে।
বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মটলি বার্নহামকে ‘নতুন পথ খোলার’ জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন, তবে স্পষ্ট করেছেন, ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুই পক্ষের মত ভিন্ন এবং তা স্পষ্ট ও সম্মানজনকভাবে বলা হবে। ক্ষমা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক দারিদ্র্য ও বৈষম্য মোকাবিলা এবং ন্যায্য ঋণ শর্তকে সমঝোতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। বাহামার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ ডেভিস বলেছেন, এই আলোচনা কেবল ঐতিহাসিক স্মরণ নয়; এটি দাসপ্রথার স্থায়ী পরিণতি এবং ন্যায়, স্বীকৃতি ও অর্থবহ প্রতিকারের বিষয়।
রবিবার সম্মেলন শুরু হচ্ছে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকীতে। রাজা চার্লস পূর্ণ ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে বার্নহামকে অনুসরণ করবেন না বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানী সেন্ট জন্সে চগম অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে রাজা চার্লস ও বার্নহামকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে; বিলবোর্ড, প্ল্যাকার্ড ও টি-শার্টে এবং আটলান্টিকপারের দাস ব্যবসায় অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় আনা হাজারো আফ্রিকানের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলনে ক্যারিবীয় বার্তা স্পষ্ট থাকবে—ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণের দাবি।



