নিজ দলের প্রার্থীকে ছেড়ে রিপাবলিকানকে সমর্থন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান স্টিভেন্সের, মিশিগান সিনেট দৌড়ে ঝড়
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে নিজ দলের প্রার্থীকে ছেড়ে রিপাবলিকান প্রার্থীর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্স। মিশিগানের সিনেট আসনের লড়াইয়ে তিনি রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের বদলে।
স্টিভেন্স আগস্টে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে এল-সায়েদের কাছে হেরেছিলেন। সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এল-সায়েদ জিতলে তিনিই হবেন মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম।
ইসরায়েল প্রশ্নে কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই ডেমোক্র্যাটের মধ্যে চলা টানাপোড়েনের পর এই সিদ্ধান্ত এল। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ জিততে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে লড়তে থাকা ডেমোক্র্যাট শিবিরে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে।
তিক্ত প্রাইমারি লড়াইয়ের পরও স্টিভেন্স এল-সায়েদকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; এমনকি গত বুধবারও তিনি বলেছিলেন, তিনি এল-সায়েদের জয় চান।
তবে তার হবু স্বামী জেসন টার্কিশ, যিনি একজন ইহুদি ডেমোক্র্যাট ও নাগরিক অধিকার আইনজীবী, আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি রজার্সকে ভোট দেবেন। টার্কিশের অভিযোগ, ইসরায়েল ও গাজার যুদ্ধ নিয়ে এল-সায়েদের বক্তব্য ইহুদি ভোটারদের অনিরাপদ বোধ করিয়েছে, যাকে তিনি ইহুদিবিদ্বেষী বলে উল্লেখ করেছেন।
স্টিভেন্স ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক, অন্যদিকে এল-সায়েদ গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং দেশটির প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রকাশ্য সমালোচক। প্রাইমারিতেও এই মতভেদ বড় ইস্যু ছিল; তখন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপ্যাক) সঙ্গে যুক্ত একটি সুপার প্যাক স্টিভেন্সের পক্ষে কয়েক কোটি ডলার খরচ করে।
সর্বশেষ বিবাদ শুরু হয় গত সপ্তাহে, যখন এল-সায়েদের সমর্থক স্বতন্ত্র গোষ্ঠী রেবেলিয়ন প্যাক একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে, যেখানে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তার সঙ্গে আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ক টানা হয়। বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, এক দম্পতি মুদি কেনাকাটার সময় ডিমের কার্টন ফেরত রাখছেন, কারণ সেই অর্থ ‘ফিলিস্তিনিদের হত্যায়’ সঞ্চয় করতে হবে।
স্টিভেন্স বিজ্ঞাপনটিকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে আখ্যা দিয়ে এল-সায়েদকে এর নিন্দা জানাতে বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলে ব্যয়ের অর্থ স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুযত্নে দেওয়া যেতে পারে বলে বলে এল-সায়েদও একই ধরনের যুক্তি দিয়েছেন।
এল-সায়েদ বলেন, বিজ্ঞাপনটি তার প্রচারণার তৈরি নয় এবং এর বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত নন। তার মতে, স্টিভেন্স রজার্সকে হারানোর বদলে প্রাইমারির পুরোনো লড়াই আবার টেনে আনছেন।
রবিবার উত্তেজনা চরমে ওঠে। ডেমোক্র্যাটিক ঐক্য দেখাতে সেদিন দুজনের একসঙ্গে একটি গির্জা অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু স্টিভেন্সকে সেখানে অনিমন্ত্রিত করা হয়। এক্স-এ দেওয়া ভিডিওতে স্টিভেন্স বলেন, ‘সিনেটের জন্য আমাদের ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী বলেছেন, তার প্রচারণায় আমি আর স্বাগত নই, আমার দূরে থাকা উচিত। তিনি ঠিকই বলেছেন। আর সে কারণেই আজ আমি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের জন্য মাইক রজার্সকে সমর্থন দিচ্ছি।’
তবে অনুষ্ঠানটি আয়োজনে সাহায্যকারী কংগ্রেসওম্যান ডেবি ডিঙ্গেল বলেন, তিনিই স্টিভেন্সকে আসতে নিষেধ করেছিলেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, বিষয়টি ‘খুব বেশি মনোযোগ ঘুরিয়ে দিচ্ছিল’।
স্টিভেন্স এল-সায়েদের সঙ্গে রাজনৈতিক স্ট্রিমার হাসান পাইকারের সম্পর্কেরও সমালোচনা করেন; পাইকারের চাচা চেঙ্ক উইগুরই ওই বিতর্কিত বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা প্যাকটির প্রতিষ্ঠাতা। পাশে রজার্সকে রেখে সাংবাদিকদের স্টিভেন্স বলেন, ‘আমরা ঘৃণার পাশে দাঁড়াতে পারি না। আমরা হাসান পাইকারের পাশে দাঁড়াতে পারি না।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি এখনো ডেমোক্র্যাট এবং ব্যালটের ৯০ শতাংশ আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদেরই ভোট দেবেন, তবে সিনেটের ভোটটি যাবে রজার্সের পক্ষে।
সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এই সমর্থনকে ‘জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, সিনেট ডেমোক্র্যাটরা ঐক্যবদ্ধভাবে এল-সায়েদের পেছনেই আছেন। অন্যদিকে এল-সায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘দিনের শেষে আমি আসলে হ্যালি স্টিভেন্সকে নিয়ে ভাবি না। রাজনীতির চেয়ে নীতির বিষয়েই আমার আগ্রহ বেশি।’ তিনি ভোটারদের স্বাস্থ্যসেবা, নাগরিক অধিকার এবং ট্রাম্প-সমর্থিত রজার্সের সঙ্গে তার পার্থক্যের দিকে মনোযোগ দিতে বলেন।
স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তের জেরে তার নিজের দলেও ভাঙন ধরেছে। আট বছর ধরে তার চিফ অব স্টাফ থাকা জাস্টিন জার্মান জানান, তিনি ও আরো কয়েকজন কর্মী এই সমর্থনের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন। সিএনএন প্রথম প্রকাশ করা বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘কংগ্রেসওম্যান স্টিভেন্সের মাইক রজার্সকে সমর্থনের সিদ্ধান্তে আমরা বিস্মিত ও মর্মাহত।’ অন্যদিকে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ওয়াও, এটা বড় খবর!’ এবং বলেছেন, ‘হ্যালি যা বললেন, তা বলার সাহস খুব কম লোকেরই আছে। এটাকেই বলে সাহস।’
স্টিভেন্স ও রজার্স প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অবসর নেওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে। এই আসনের ফল মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যাবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে কংগ্রেসের দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে; ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এজেন্ডা আটকাতে ও তার প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়াতে পর্যাপ্ত আসন জিততে চায়। প্রাইমারিতে স্টিভেন্স ডেট্রয়েটসহ ওয়েন কাউন্টি ও প্রতিবেশী ওকল্যান্ড কাউন্টিতে জিতেছিলেন — দুটি কাউন্টিই ডেমোক্র্যাট শক্ত ঘাঁটি, যেখানে মঙ্গলবারের ফলে ভোটার উপস্থিতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রয়টার্সের তথ্যে, জরিপে দেখা যাচ্ছে এল-সায়েদ মোটামুটি ডেমোক্র্যাট সমর্থন সংহত করেছেন; আগাম ভোট শুরু হয়েছে ২৪ অক্টোবর থেকে, সর্বশেষ এই বিবাদ শুরু হওয়ার আগেই।


