তিতাসে আরও দুটি কূপ খননের পরিকল্পনা: ৫৯২ কোটি টাকায় দিনে মিলতে পারে ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস

দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসে আরও দুটি কূপ খনন করতে চায় সরকার। তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে এই দুটি মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ খননে খরচ ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। কূপ দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বুধবারের সভায় মোট ১৪টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সভাটি গত ২৫ অক্টোবর হওয়ার কথা ছিল; প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কারণে তা পিছিয়ে যায়।
পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) তিতাস প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের মোট খরচের মধ্যে সরকার দেবে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বাকি ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আসবে বিজিএফসিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে। চলতি অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা।
প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে কূপ দুটি খনন করা হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ ও গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন বসানো হবে। শুরুতে প্রকল্পের খরচ প্রস্তাব করা হয়েছিল ৬৩২ কোটি টাকা। গত ১৮ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। এরপর খরচ ৪০ কোটি টাকা কমানো হয়।
প্রকল্প প্রস্তাবের হিসাব অনুযায়ী, কূপ দুটি থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। সঙ্গে পাওয়া যাবে ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট। বিজিএফসিএলের বর্তমান দামে এই গ্যাস ও কনডেনসেটের মূল্য প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকা। তবে ভোক্তাপর্যায়ের দামে শুধু গ্যাসের মূল্যই দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা, যা প্রকল্প খরচের ১১ গুণের বেশি।
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ চালানো হয়েছিল। সেই জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিএনপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেড। তারা তিতাস ও বাখরাবাদ ক্ষেত্রে ১৬টি নতুন কূপ এবং ৭টি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ থেকেই তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩-কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে স্থলভাগে ১৫০টি কূপ খননের যে পরিকল্পনা সরকারের আছে, এই দুটি কূপ তারই অংশ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস দেশের প্রথম ও বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান শেল অয়েল কোম্পানি এটি আবিষ্কার করে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। শুরুতে এই ক্ষেত্রে প্রমাণিত মজুত ছিল ৭ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৬ টিসিএফ গ্যাস তোলা হয়ে গেছে।
তিতাসে এ পর্যন্ত খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে এখন দিনে প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই একটি ক্ষেত্র থেকে। সে হিসাবে নতুন দুটি কূপ চালু হলে তিতাসের উৎপাদন প্রায় ৯ শতাংশ বাড়বে।
তিতাসে নতুন কূপ খননের কাজ এর মধ্যেই চলছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তিতাস-২৮ কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপের খননকাজ চলছে।
তিতাস প্রকল্প ছাড়াও বুধবারের একনেক সভায় বাংলাদেশ পুলিশের জন্য বিশেষায়িত ও অপারেশনাল যানবাহন কেনার প্রকল্প উঠছে। নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতের প্রকল্পের মধ্যে আছে ‘ইনোভেশন ক্লাইমেট স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়নের প্রকল্পও রয়েছে।
এ ছাড়া পাঁচটি মেডিকেল কলেজে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টার স্থাপন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের খাল পুনরুদ্ধার ও পুনঃখনন (প্রথম পর্ব) এবং নির্বাচিত পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্প তালিকায় আছে। ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডে কর্মকর্তাদের বাসস্থান নির্মাণ, জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, ‘মেট্রো ঢাকা: ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন’ এবং গ্রামীণ সড়কে ১৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সেতু-কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পও উঠবে সভায়। শুরুতে সভার জন্য ১৫টি প্রকল্পের তালিকা করা হয়েছিল; পরে তা থেকে একটি বাদ দেওয়া হয়।
পরিকল্পনাসচিব এস এম শাকিল আকতার বলেন, ‘প্রকল্পের সংখ্যা বেশি হওয়ায় একটি কমানো হয়েছে। যেসব প্রকল্প খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো উপস্থাপনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে।’ তিনি জানান, এর বাইরে ৫০ কোটি টাকার কম খরচের চারটি প্রকল্প সভায় অবহিত করা হবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এরই মধ্যে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দিয়েছেন। এগুলো হলো দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের হৃদরোগ চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন, শিশু-কিশোর ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়ক নিরাপত্তা এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ।



