অল্প সময়ে ফসল আর ভালো দাম: মুড়িকাটা পেঁয়াজে কেন ঝুঁকছেন কৃষকেরা

রংপুরের পীরগঞ্জের চাষি মো. এনামুল হক এবার পঞ্চাশ শতক জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন। তাঁর মতে, এটি শীতকালের শুরুতে বাজারে আসে বলে বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যায়।
এনামুল হক বলেন, অল্প সময়ে ফসলটা ঘরে আসে আর লাভও ভালো পাওয়া যায়। তবে সমস্যা হলো, কাঁচা অবস্থায় কাটা হয় বলে পনেরো দিনের মধ্যেই এটি বিক্রি করে দিতে হয়। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর এলাকায় ৯০ ভাগ জমিতেই চাষিরা এই সময়ে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করে থাকেন।
আরেক কৃষক মো. ইসমাইল হোসেন বলছেন, প্রতি আড়াই শতক জমিতে প্রায় পাঁচ মণ পর্যন্ত মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন করেন তাঁরা। তিনি বলেন, রোপণের ৪৫-৬০ দিনের মধ্যে পাতাসহ, এমনকি কাণ্ডসহ পেঁয়াজটা বিক্রি করা হয়। রোপণের জন্য ছোট পেঁয়াজ আনা হয় পাবনা কিংবা কুষ্টিয়া থেকে, আর এর প্রতিটি থেকে চারটি পর্যন্ত পেঁয়াজ হয়।
পীরগঞ্জের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ বলছেন, ওই উপজেলাতেই প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তিনি জানান, এর মধ্যেই রোপণ হয়ে গেছে, আর ৩৫-৪০ দিনের মধ্যে পাতাসহ এই পেঁয়াজের দেখা মিলবে মাঠে। কৃষকদের কেউ পাতাসহ, আবার কেউ মুড়ি কেটে বিক্রি করবেন। এখানে ছোট কিন্তু আস্ত পেঁয়াজ রোপণ করা হয়; বাজারে সাধারণত যে পেঁয়াজ দেখা যায়, সেটি বীজ থেকে চারা করে সেই চারা রোপণ করা হয়।
মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসলে কী, তা ব্যাখ্যা করেছেন ফরিদপুরের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলাউদ্দিন খান। তিনি বলেন, পেঁয়াজের সেট বা গুটি আবাদ করে যে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, সেটিই মুড়িকাটা পেঁয়াজ। গাছের ওপরের অংশ কেটে ফেলাকেই মুড়িকাটা বলে—প্রথমে পেঁয়াজের গুটি বা সেট পাতাসহ সংগ্রহ করা হয়, এরপর গুটির গলা থেকে ওপরের অংশ কাটা হয়, পরে সেই গুটি থেকে যে পূর্ণ আকারের পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, সেটিই মুড়িকাটা পেঁয়াজ।
ড. আলাউদ্দিন খানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক মোট উৎপাদিত মুড়িকাটা পেঁয়াজের পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন, আর দেশে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশই মুড়িকাটা পেঁয়াজ।
বাংলাদেশে সাধারণত তিনভাবে পেঁয়াজ আবাদ করা হয়—পেঁয়াজের চারা রোপণ (হালি পেঁয়াজ), পেঁয়াজের সেট বা গুটি রোপণ এবং সরাসরি পেঁয়াজের বীজ বপন পদ্ধতি। যেসব এলাকায় শীত বেশি থাকে, সেসব এলাকায় পেঁয়াজ বেশি জন্মায়। এর মধ্যে পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রংপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরসহ বেশ কিছু জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে এবং এটি প্রতিবছরই বাড়ছে।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলছেন, ওই জেলায় প্রায় নয় হাজার হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে এবার। তাঁর ভাষায়, একটি পূর্ণাঙ্গ পেঁয়াজ বিশেষ উপায়ে রোপণ করার পর ওই পেঁয়াজের মূল থেকে নতুন পেঁয়াজ হয়, এভাবেই এটি মুড়িকাটা পেঁয়াজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অধিকাংশ জায়গায় রোপণ হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও এখনো রোপণ চলছে। এই পেঁয়াজ পাতাসহ তোলা হয় এবং এটি সংরক্ষণ করা যায় না।
কৃষিবিদরা বলছেন, রোপণের ৯০ দিনের মধ্যেই এই পেঁয়াজ তোলার মতো হয়ে যায়। ফলে ওই একই জমিতে পরে মরিচ, আলুসহ বিভিন্ন শস্য আবাদ করতে পারেন চাষিরা। সাধারণত অক্টোবর ও নভেম্বর মাস হলো মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণের উপযুক্ত সময়। খানিকটা উঁচু বা মাঝারি উঁচু দোআঁশ মাটি এর আবাদের উপযোগী, আর জমিতে পানি থাকলে এটি আবাদ করা যায় না। রোপণের তিন মাসের মধ্যে গাছের পাতা উঁচু হয়ে খানিকটা ঝুঁকে গেলে ফসল তোলার উপযোগী হয়।
সাধারণত পাতাসহ কৃষকরা পেঁয়াজ তুলে বিক্রি করে থাকেন। সংরক্ষণ করতে হলে শেকড়সহ গাছ তুলে মাথার অংশ কেটে রাখতে হয়। তবে মুড়িকাটা পেঁয়াজ মাঠ থেকে তোলার সময় ভেতরটা কিছুটা কাঁচা থাকে, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না, ফলে এটি দ্রুত বিক্রি করতে হয়।
সময়ের হিসাবটাও গুরুত্বপূর্ণ। ড. আলাউদ্দিন খান বলেন, পেঁয়াজের মূল আবাদ মৌসুম শুরু হয় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আর সেটি বাজারে আসে মার্চ-এপ্রিলের দিকে। এর আগেই মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসার কারণে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও এটি ভূমিকা রাখে।
জলবায়ুর সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। ড. খান বলেন, ফসলটি শীতকালে আসে, সে কারণে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এড়াতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের সময়কাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে প্রচলিত পেঁয়াজের প্রধান মৌসুমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে মূল মৌসুম আসার আগেই মুড়িকাটা চাষ করে কৃষক লাভবান হতে পারেন, আবার বাজারেও সরবরাহ ঠিক থাকে। আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় যথাসময়ে এর আবাদ শুরু করা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
তবে ঝুঁকিও আছে। কৃষকদের কেউ কেউ বলেছেন, অনেক সময় শীতকালে বিদেশ থেকে দেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়; তখন শীতকালীন পেঁয়াজ হিসেবে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন করেও লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েন তাঁরা। অন্যদিকে শীত মৌসুমে আসার কারণে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেশি হয়ে থাকে।
স্বাদের দিক থেকেও এর কদর আছে। কৃষক এনামুল হক ও ইসমাইল হোসেন দুজনেই বলেছেন, মুড়িকাটা পেঁয়াজের স্বাদ তাঁদের কাছে বেশি ভালো মনে হয়। ড. আলাউদ্দিন খান বলেন, কচি সবুজ পাতাসহ মুড়িকাটা পেঁয়াজেরও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে, আর এর কচি ফুল পেঁয়াজের সবজি ও সালাদের উপকরণ হিসেবে আলাদা কদর আছে।



