শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, দায়িত্বে ২১ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট

পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা জেলার শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করবেন। সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরুল করিম ভূঁইয়া।
জেলা প্রশাসক বলেন, শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে চলমান শ্রমিক বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন। আন্দোলনের নামে যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো ক্ষতি না হয়, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। ইতিমধ্যে বিজিবি সদস্যরা মাঠে অবস্থান নিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রস্তুত রয়েছেন।
বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ বক্স, কারখানার গুদাম ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দিনভর বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে তাঁরা বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এতে পুলিশ বক্স, কারখানার গোডাউন, মার্কেট, ব্যাংকের শাখা, দোকানপাট ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকার পর দুপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পর শ্রমিকেরা মহাসড়ক ছেড়ে দেন। এরপর যান চলাচল শুরু হলেও অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে চলাচল ধীর ছিল।
এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে জেলার বহু পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
রোববার দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড নামের একটি কারখানার ঝুটের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দুপুরে এই অগ্নিকাণ্ডের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। তবে শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়।
সোমবার ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর খবরে বলা হয়েছে, শ্রম অসন্তোষে একদিনেই দেশের বিভিন্ন শিল্প অধ্যুষিত এলাকার ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক গতকাল কাজ না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা।
এই পরিস্থিতিতে রোববার (১ নভেম্বর) রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় থাকলেও সরকার মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আগেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিধির নাম পেতে কিছুটা বিলম্ব হয়। গতকাল রাতে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম পাওয়ার পর আজ (রবিবার) সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনমান, পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন এবং আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করবেন। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সহিংস আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, বিভিন্ন স্থানে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর ও কারখানায় অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা সহিংসতায় জড়িত হবে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করবে কিংবা অযথা বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের কঠোরভাবে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, সরকারের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে কেউ কেউ ইন্ধন জোগাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতা সরকার কঠোরভাবে দমন করবে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন ছেড়ে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার সকালে গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েনের মধ্য দিয়ে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি এখন সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপ ও মাঠের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে।




