রাশিয়া ও ইউক্রেনের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে সাইবার হামলা, ছড়ানো হয় ভুয়া সতর্কবার্তা

রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশেরই জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। দুই দেশের অ্যালার্ট অ্যাপ হ্যাক করে ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মস্কোর জরুরি বা দুর্যোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের অ্যালার্ট অ্যাপে একটি ‘বড় ধরনের সাইবার হামলা’ চালানো হয়েছে, যার মাধ্যমে হ্যাকাররা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারত। হামলার পেছনে কে রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানায়নি রাশিয়া।
রুশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের অ্যাপ এখনো বন্ধ রয়েছে, তবে বৃহত্তর পাবলিক অ্যালার্ট সিস্টেম ‘স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছে’। সাইরেন ও লাউডস্পিকার, টেক্সট মেসেজ এবং টিভি ও রেডিও সম্প্রচারসহ একাধিক চ্যানেলে নাগরিকদের সতর্কবার্তা জানানো হচ্ছে।
টেলিগ্রাম চ্যানেলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে, অ্যাপটি ‘শুধুমাত্র একটি অতিরিক্ত, সহায়ক নিউজ সার্ভিস মাত্র’ এবং ‘মোবাইল অ্যাপ হ্যাক হওয়ার ফলে পাবলিক অ্যালার্ট সিস্টেমের কার্যকারিতায় কোনো প্রভাব পড়েনি’। অ্যাপটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন এবং পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এর ঠিক কিছুদিন আগেই ইউক্রেনের বিমান হামলার সতর্কতা অ্যাপে হ্যাকিংয়ের কারণে ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল; সতর্কতাগুলোর একটি ছিল রুশ ভাষায় একটি বার্তা। ইউক্রেন সরকারের স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস সেন্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে করা এক পোস্টে এই হ্যাকিংয়ের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে এবং অ্যাপে প্রদর্শিত সতর্কতার একটি ছবি পোস্ট করেছে।
একই সঙ্গে নাগরিকদের অ্যাপে দেখা যেকোনো ‘অদ্ভুত বার্তা’ ‘উপেক্ষা’ করার আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির বিমান বাহিনী নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে; টেলিগ্রামে পাঠানো সতর্কবার্তায় বলা হয়, কোনো তেজস্ক্রিয়তার হুমকি নেই এবং নিজেদের চ্যানেলে আপডেট অনুসরণ করতে হবে।
ইউক্রেনের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, অ্যাপটিতে একটি যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে এবং বিমান হামলার হুমকি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য ব্যবহার করতে নাগরিকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই এয়ার অ্যালার্ট অ্যাপটি ইউক্রেনের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন মন্ত্রণালয়ের; এটি ব্যবহারকারীদের প্রতিরক্ষা সতর্কতার শুরু ও শেষ সম্পর্কে অবহিত করে।
ইউক্রেনে ভুয়া সতর্কবার্তাগুলো পাঠানো হয়েছিল ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার দখলে থাকা সম্মুখসারির শহর ওলেশকির যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঠিক কয়েক মিনিট আগে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এবং পোপ লিও চতুর্দশের মধ্যস্থতায় হওয়া এক চুক্তির মাধ্যমে বিরল এই ছয় দিনের যুদ্ধবিরতি ওলেশকি থেকে শত শত মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
তবে ওলেশকিতে লড়াই পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ উভয় পক্ষই এই সময়টিকে সম্মুখসারির বাহিনীগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যবহার করার জন্য একে অপরকে অভিযুক্ত করেছে। কিয়েভের কর্মকর্তারা বলছেন, এই মানবিক মিশন ‘পদ্ধতিগত সমাধান’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং ‘শান্তি প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর পথ প্রশস্ত করতে পারে’।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে ওলেশকি অপারেশন সমন্বয়কারী ইয়ানা লান্ত্রাতোভা বলেছেন, উভয় দেশই ‘নিয়মিত মানবিক মিশন’ চালাতে রাজি হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্রের ভাষায়, ক্রেমলিন এ ধরনের অপারেশনগুলোকে শান্তি প্রক্রিয়া থেকে আলাদা হিসেবে দেখে।
এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। রাশিয়া জানিয়েছে, রাতে পূর্ব মস্কোর একটি ‘শিল্প প্রতিষ্ঠানে’ ড্রোন হামলা হয়েছে, যেটিকে ইউক্রেনের গণমাধ্যম কস্তোভো তেল শোধনাগার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিজনি নভগোরদ অঞ্চলের গভর্নর গ্লেব নিকিতিন ‘বড় ধরনের’ ড্রোন হামলার কথা জানিয়ে প্ল্যান্টে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গরম পানির সরবরাহ হ্রাসের বিষয়ে সতর্ক করেছেন; ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের কারণে একজন নারী আহত হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, শনিবার রাতে রাশিয়া চারটি অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে লক্ষাধিক ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে; রয়টার্সের প্রতিবেদনে তার উদ্ধৃতি দিয়ে হামলার তীব্রতা ‘খুব বেশি’ ছিল বলে জানানো হয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে বারবার রাশিয়ার তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রাশিয়ার জরুরি অ্যাপে পাঠানো ভুয়া সতর্কবার্তায় ব্যবহারকারীদের বলা হয়েছিল, ইউক্রেনের আক্রমণকারী ড্রোনে স্থাপন করা পারমাণবিক ওয়ারহেড রাশিয়ার সব অঞ্চলে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বার্তাটিতে নাগরিকদের তিন সপ্তাহের জন্য খাবার মজুত করে লুকিয়ে পড়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল।


