অসুস্থতায় ক্যারিয়ার থামলেও থামেননি বীথি, এখন রংপুর বিভাগের প্রধান কোচ
নয় বছর আগে অসুস্থতার কারণে পেশাদার ক্রিকেট থেকে ক্যারিয়ার গুটিয়ে নিতে চেয়েছিলেন আরিফা জাহান বীথি। ব্যাট-বলের লড়াই ছেড়ে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজের শহরে। কিন্তু বাইশ গজের টান তিনি ছাড়তে পারেননি।
দুই বছর না যেতেই নিজের স্বপ্ন অন্যের ব্যাট-বলের লড়াইয়ে দেখার আশায় বীথি গড়ে তোলেন উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি। প্রশিক্ষক হিসেবে তার লক্ষ্য ছিল জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরি করা।
সেই স্বপ্ন এখন বড় পরিসর ছুঁয়েছে। তৃণমূলে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া বীথিকে এবার কোচ হিসেবে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)—তাও বিভাগীয় প্রধান কোচ হিসেবে। দেশের প্রথম নারী ক্রিকেট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা বীথি রংপুর বিভাগের প্রধান কোচের দায়িত্ব পাচ্ছেন। তার সঙ্গে সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করবেন মুর্শেদা খাতুন সোমা এবং ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করবেন মনিকা আক্তার আশা।
দেশের নারী ক্রিকেটের উন্নয়ন ও তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার তুলে আনতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। এর অংশ হিসেবে রংপুরসহ আট বিভাগে নারী ক্রিকেটের কোচিং স্টাফ নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণ, পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচিত কোচ ও কর্মকর্তারা।
বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, বিভাগীয় পর্যায়ে কোচ ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক ক্রিকেটার এবং কোচিংয়ের লেভেল-১ সনদধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় প্রধান কোচের দায়িত্ব পাওয়ায় বিসিবিসহ রংপুর বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বীথি বলেন, ‘এই দায়িত্ব পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের, সম্মানের এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ ৭ বছরের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার ফল আমার আজকের এই অবস্থান।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই নতুন দায়িত্ব অবশ্যই আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং, তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব খেলোয়াড়দের পাশে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে এবং রংপুর বিভাগের নাম আরও উজ্জ্বল করতে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করতে যা যা প্রয়োজন, তার জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করব।’
ষোলো বছর আগে, ২০১০ সালে, পেশাদার লিগে নাম লেখান আরিফা জাহান বীথি। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাব ও ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট একাডেমির হয়ে তিনি ফার্স্ট ডিভিশন খেলেছেন।
২০১৭ সালে হঠাৎ করেই তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ঝড় আসে। ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশনের এক ম্যাচ চলাকালে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, নাকে ইনফেকশন হয়েছে এবং খেলা চালিয়ে গেলে বড় ক্ষতি হতে পারে। ফলে তাকে ক্রিকেট ছেড়ে দিতে হয়।
২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর রংপুর জেলা স্টেডিয়ামে নারীদের জন্য উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি নামে প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়েন বীথি। সেখানে প্রথম অবস্থায় প্রায় আড়াইশ নারীকে বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ থেকে শুরু হয় তার প্রচেষ্টা।
করোনা মহামারির সময় বীথির মানবিক রূপও সামনে আসে। মহামারির শুরুর দিকে তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবায় নেমে পড়েন। তার আহ্বানে ক্রিকেটার তামিম ইকবাল, রুবেল হোসেনসহ অনেকেই সাড়া দিয়ে পাশে দাঁড়ান। নিজের জমানো টাকা আর অন্যের আর্থিক সহযোগিতা মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষের কাছে তিনি চাল, ডাল, তেল, লবণ, ফল, দুধ, ডিম ও হরলিকসসহ প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দেন। পরে তার একাডেমির নাম হয় ‘উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’।
বীথির হাত ধরে ইতোমধ্যে শতাধিক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। গৃহহীন বৃদ্ধ মা-বাবা পেয়েছেন নতুন ঘর, সহায়-সম্বলহীন শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে ভর্তির জন্য তিনি আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
