গ্যারেজে বড় হওয়া ছেলেটাই এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন: ২০ বছরেই ফর্মুলা ওয়ানের মুকুট কিমি আন্তোনেল্লির

মাত্র ২০ বছর বয়সে ফর্মুলা ওয়ানের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ইতালির কিমি আন্তোনেল্লি। গত আগস্টে ২০ বছর পূর্ণ করা এই চালক মাত্র দ্বিতীয় মৌসুমেই খেলাটিতে আধিপত্য গড়ে তুলে এই খেলার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।
তার বাবা মার্কো আন্তোনেল্লির ভাষায়, কিমি যেন 'গ্যারেজেই জন্মেছিলেন'। জন্মের ১৫ দিন বয়স থেকেই তিনি গ্যারেজে থাকতেন, শুনতেন ইঞ্জিনের শব্দ আর পেতেন ধোঁয়ার গন্ধ। মার্কো ও তার স্ত্রী ভেরোনিকা নিজেদের রেসিং দলের ব্যবসা চালাতেন।
বড়দিনের ছুটির সময় কিমির বয়স ছিল প্রায় তিন বছর। বোলোনিয়া মোটর শোর অতিথিদের জন্য কেনা একটি রেসিং সিমুলেটর মার্কো বাড়িতে এনেছিলেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কিমি গাড়ি চালাতে চাইতেন; বাবার কোলে বসে ভাগাভাগি করে নিয়ন্ত্রণ সামলাতেন দুজনে। এক রাতে কাজ থেকে ভোরে ফেরা মার্কো ঘুমিয়ে পড়ায় সোজা পথের শেষে ব্রেক করা হয়নি, দুর্ঘটনা ঘটে। কিমি তখন বাবাকে বলেছিলেন, 'বাবা, বাবা, ঘুম নয়, ঘুম নয়। আমাকে চালাতেই হবে।'
মার্কো নিজে একসময় চালক ছিলেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি ডিটিএম ট্যুরিং কার সিরিজে ওয়ার্কস চালক হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। আলফা রোমিওতে পরীক্ষা দিলেও দলপ্রধান চলে যাওয়ায় সুযোগটি হাতছাড়া হয়; পরে রবার্তো রাভাগলিয়া ও স্টিভ সোপারের পাশাপাশি বিএমডব্লিউতেও আরেকটি সুযোগ একইভাবে হারিয়ে যায়। নিজের এই কষ্টের অভিজ্ঞতার কারণে শুরুতে ছেলের মোটরস্পোর্টের প্রতি আগ্রহ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
কিমি পাঁচ বছর বয়সে প্রথম গো-কার্ট চালান। তখনই তার মধ্যে রেসিং লাইন, ব্রেকিং পয়েন্ট ও গাড়ি নিয়ন্ত্রণের সহজাত ধারণা দেখা যায়।
কিমি যখন ১০ বছর বয়সী, তখন উত্তর-পূর্ব ইতালির আদ্রিয়া সার্কিটে একদিনের শেষে মার্কো তাকে নিজের ল্যাম্বরগিনি চালানোর প্রস্তাব দেন। দুজনে একসঙ্গে বেল্ট বেঁধে বসেন; থ্রটল ও ব্রেকের দায়িত্বে ছিলেন মার্কো, বাকি নিয়ন্ত্রণ ছিল কিমির হাতে। ধাপে ধাপে গতি বাড়তে থাকে; সোজা পথের শেষে ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতিতে কঠিন ব্রেক করার পর গাড়িতে অতিরিক্ত ওভারস্টিয়ার দেখা দিলে ১০ বছরের কিমি তা নিখুঁতভাবে সামলে নেন, গিয়ার বদলে আবার গতি তোলেন। ভিডিও দেখে মার্কো সেদিনই বুঝেছিলেন, ছেলের মধ্যে বিশেষ কিছু আছে।
আন্তোনেল্লি পরিবার নিজেদের 'সাধারণ পরিবার' বলে বর্ণনা করেন। ফর্মুলা ওয়ান পর্যন্ত সব ধাপের খরচ জোগানো তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মার্কো ঠিক করেছিলেন, তিনি কিমিকে কার্টিং ও বেসিক একক-আসনের শ্রেণি ফর্মুলা ফোরের এক বছর পর্যন্ত অর্থ দিতে পারবেন; এরপর নিজের জিটি গাড়িতে বসিয়েই ছেলেকে পেশাদার বানানোর ভাবনা ছিল তার।
কিন্তু কিমি যে শ্রেণিতেই নামতেন, দ্রুতই মুগ্ধ করতেন এবং জিততেন। ১১ বছর বয়সেই তার নাম রেসিং মহলে ছড়িয়ে পড়ে। মার্সিডিজের চালক একাডেমির স্কাউট গুয়েন লাগ্রু ইতালিতে উড়ে গিয়ে তাকে দেখেন। ওই মৌসুমে কিমি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কম শক্তির কার্ট চালাচ্ছিলেন; মার্কো তাকে বলেছিলেন, ফলাফল নয়, উন্নতির দিকেই মন দিতে। লাগ্রু এই পরিস্থিতিতেই কিমির চালানো দেখে মুগ্ধ হন। এরপর মার্সিডিজ একাডেমিতে জায়গা পাওয়ায় মার্কোকে অর্থ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছাড়তে হয়।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ম্যাক্স ভার্স্টাপেন, যিনি নিজেও কিশোর বয়সে ফর্মুলা ওয়ান রেস জেতা একমাত্র অন্য চালক, বলেছেন, কার্টিংয়ের সময় থেকেই বোঝা যাচ্ছিল কিমি অন্যতম সেরা প্রতিভা।
১৫ বছর বয়সে গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি হিসেবে গিয়ারযুক্ত কার্টিং শ্রেণিতে কয়েকটি রেসে অংশ নেন কিমি। অভিষেকেই ন্যূনতম প্রস্তুতি নিয়েই তিনি পোল পজিশন পান; বিশ্ব ফাইনালেও আবার পোল পান। ২০২১ সালের শেষে তিনি পুরোপুরি গাড়ির জগতে চলে আসেন। ২০২২ সালে ফর্মুলা ফোরের বিভিন্ন চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি প্রায় সবকিছু জেতেন, ২০২৩ সালে ফর্মুলা রিজিওনালেও একই সাফল্য আসে।
ততদিনে মার্সিডিজ দলপ্রধান টোটো ভলফ তাকে লুইস হ্যামিল্টনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। ২০২৩ সালে হ্যামিল্টনের নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনায় হ্যামিল্টন অন্তত দুই বছরের নিশ্চিত চুক্তি চেয়েছিলেন, ভলফ চেয়েছিলেন এক বছর; শেষে ২০২৪ সালের চুক্তি ও ২০২৫ সালের বিকল্পে সমঝোতা হয়। অসন্তুষ্ট হ্যামিল্টন ২০২৫ সালে ফেরারিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারির শেষে ভলফকে তা জানান।
ভলফ সঙ্গে সঙ্গে মার্কোকে ফোন করে বলেন, 'আমরা কিমিকে ফর্মুলা ওয়ানে বসাচ্ছি।' মার্কো জবাবে প্রশ্ন করেছিলেন, কিমি সত্যিই প্রস্তুত কি না। তখন পর্যন্ত কিমি কোনো ফর্মুলা ওয়ান গাড়িই চালাননি। মার্সিডিজ তার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ট্র্যাকে পুরোনো মডেলের গাড়িতে ২০ দিনের বেশি পরীক্ষামূলক চালানোর কর্মসূচি সাজায়, যাতে ২০২৫ সালে অভিষেকের জন্য তিনি প্রস্তুত হন।
ট্র্যাকসাইড প্রকৌশল পরিচালক অ্যান্ড্রু শভলিনের ভাষায়, প্রকৌশলীরা মুগ্ধ হয়েছিলেন কিমি কত দ্রুত গতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলেন তা দেখে। তার মতে, কিমি দু-একবার চালিয়েই গাড়ির আচরণ বুঝে প্রায় সীমা পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন, আর তার গাড়ি নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্মতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিমির ভুলগুলো ছিল বিচার বা অভিজ্ঞতার ঘাটতির, প্রতিভা ফুরিয়ে যাওয়ার ভুল নয় — বলেছেন শভলিন।
২০২৪ সালের ইতালিয়ান গ্রাঁ প্রিতে নিজের ঘরের রেস মনজায় প্রথম অনুশীলন সেশনে ফর্মুলা ওয়ান সপ্তাহান্তের প্রথম অভিজ্ঞতা পান আন্তোনেল্লি। প্রথম ল্যাপেই তিনি দ্রুততম সময় গড়েন; এরপর আরও দ্রুত ছুটতে গিয়ে সেই অভিষেক ভালো-মন্দ দুই কারণেই স্মরণীয় হয়ে ওঠে। তার পুরো নাম আন্দ্রেয়া কিমি আন্তোনেল্লি; ঘনিষ্ঠজনরা তাকে 'আন্দ্রেয়া' বলে ডাকলেও ফর্মুলা ওয়ানে তিনি 'কিমি' নামেই পরিচিত।

