কমিউনিস্ট যুগের হাজার হাজার গোপন তথ্যদাতার নাম প্রকাশ করতে যাচ্ছে হাঙ্গেরি

হাঙ্গেরির নতুন সরকার বুধবার কমিউনিস্ট যুগের কয়েক হাজার রাষ্ট্রীয় তথ্যদাতার নাম প্রকাশ করতে যাচ্ছে। অতীতের মুখোমুখি হওয়া এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
১৯৪৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সমাজের ওপর নজরদারি ও ভিন্নমত দমনে বিস্তৃত তথ্যদাতা নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করত। কাউকে ব্ল্যাকমেইল করে বা বলপ্রয়োগে বাধ্য করে প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী এমনকি পরিবারের সদস্যদের ওপর নজরদারি করানো হতো; আবার কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতো নানা সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
দশকের পর দশক এই নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি জনসমক্ষের আড়ালে ছিল। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সেবাগুলোর ঐতিহাসিক আর্কাইভের বেসমেন্টে রাখা 'এজেন্ট ফাইল'গুলো বারবার দাবি ওঠা এবং আংশিক ফাঁসের ঘটনা সত্ত্বেও মূলত জনসাধারণের নাগালের বাইরেই থেকে যায়।
হাঙ্গেরির এপ্রিলের সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারণায় পেতের মাগিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ফাইলগুলো প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে এগিয়ে যাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে তাঁর সরকার ফাইলগুলো প্রকাশের পথ সুগম করে একটি আইন পাস করে। জরিপ অনুযায়ী, দেশটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। প্রকাশের দিনটি প্রথমে ১৯৫৬ সালের সোভিয়েতবিরোধী বিপ্লবের বার্ষিকীতে নির্ধারিত থাকলেও পরে তা পিছিয়ে ৪ নভেম্বর করা হয়।
সামাজিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতিমন্ত্রী জোলতান তার ফেসবুকে লিখেছেন, 'গণতান্ত্রিক সমাজের তার অতীত জানার অধিকার রয়েছে।'
আগে তথ্যদাতাদের বিষয়ে তৈরি প্রতিবেদন দেখার সুযোগ সীমিত ছিল গবেষক ও ভুক্তভোগীদের স্বজনদের মধ্যে। অনুসন্ধানযোগ্য নতুন অনলাইন ডাটাবেস চালু হলে হাঙ্গেরির সাবেক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সেবা প্রাক্তন পূর্ব ব্লকের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ হয়ে উঠবে বলে গবেষকদের মত।
আর্কাইভের একাডেমিক বিভাগের প্রধান ইতিহাসবিদ ইস্তভান পাপ বলেছেন, 'আমরা অর্ধখোলা রেখে দেওয়া একটি দরজা পুরোপুরি খুলে দিচ্ছি।' তাঁর ভাষ্য, ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি ফাইল প্রকাশের পক্ষে; তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি তাদের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন, যারা প্রথমবারের মতো নিজেদের পরিবারের ইতিহাসের মুখোমুখি হবেন। ফাইলে নাম থাকা ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মানুষের মধ্যে ইতিহাসবিদদের ধারণা, প্রায় ১০ শতাংশ আজও জীবিত।
গত তিন দশকে প্রাক্তন পূর্ব ব্লকের দেশগুলো এজেন্ট ফাইল প্রকাশের প্রশ্নে বিভক্ত ছিল। পূর্ব জার্মানিতে ১৯৯২ সালে বুন্ডেসটাগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা স্টাসির ফাইল খুলে দেয়। চেক প্রজাতন্ত্রে সেগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয় ২০০৩ সালে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ লাতভিয়া, তারা ২০১৮ সালে তথ্যদাতাদের ফাইল প্রকাশ করে।
হাঙ্গেরির একটি জোরপূর্বক শ্রম শিবির থেকে বেঁচে ফেরা এবং ভুক্তভোগীদের একটি সংগঠনের সভাপতি মিকলোশ কিসের মতে, হাঙ্গেরি জার্মানির উদাহরণ অনুসরণ করে আরও আগেই ফাইলগুলো প্রকাশ করলে ভালো হতো। তিনি বলেন, 'তাহলে সবকিছু অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত।' তাঁর ভাষ্য, 'মানুষ জানতে পারবে, প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি পাড়ায় ও রাস্তায় বিশ্বাসঘাতক ছিল। কিন্তু এখন তা দিয়ে আমরা কী করব?'
পাশাপাশি সাজিয়ে রাখলে এই নথিগুলোর মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় তিন মাইল। তবে পোল্যান্ড বা রোমানিয়ার গোপন সেবার সংগ্রহের তুলনায় এই সংগ্রহ ছোট বলে জানান পাপ। হাঙ্গেরিতে ১৯৫৬ সালের সোভিয়েতবিরোধী অভ্যুত্থানের সময় অনেক ফাইল ধ্বংস হয়ে যায়; আরও অনেক ফাইল হারিয়ে যায় ১৯৮৯ সালের রূপান্তরের সময়, যখন অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তিমূলক নথি সরিয়ে ফেলার সময় পেয়েছিল।
অনেক নথিই অসম্পূর্ণ থাকবে, কারণ সংশ্লিষ্ট এজেন্টের উদ্দেশ্য বা তিনি কতটা প্রতিবেদন দিতেন, তা অজানা থেকে যাবে। ফাইলে উল্লিখিত ৬০ হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র ৯ হাজার জনের বিস্তারিত ফাইল, পটভূমি যাচাই ও বিবৃতি আর্কাইভে রয়েছে। গোপনীয়তা আইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য, আসক্তি ও যৌনতা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্যসহ ভুক্তভোগীদের তথ্য মুছে ফেলে সেগুলো আগামী ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করা হবে।




