মিরপুরে মজুরি আন্দোলন: চার মামলায় আসামি সাড়ে ১০ হাজার, গ্রেপ্তার ২২; জানুয়ারির বেতনেই বাড়তি মজুরির আশ্বাস

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ২২ জন।
সোমবার দুপুরে মিরপুর মডেল ও পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) এসব তথ্য জানান।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁর থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, সোমবারও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে তাঁর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। সব মামলার বাদী পুলিশ।
তিনি বলেন, প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে দাবি করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান বিক্ষোভ তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। সোমবার সকাল থেকে মিরপুর-১৪ নম্বর ও মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় দফায় দফায় শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার চেষ্টা, পুলিশের ধাওয়া ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর শ্রম ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাবুল আখতার বলেন, ‘২০২৭ সালের জানুয়ারির বেতনের সাথে কমবেশি যাই হোক না কেন, সেটা যেন শ্রমিকরা হাতে পায়। আমাদের বিলম্ব করার কিছু নেই, মানসিকভাবে আমরা রেডি।’
তিনি আরও বলেন, আগামী জানুয়ারি মাস থেকেই শ্রমিকেরা যেন বর্ধিত মজুরি পান, সে লক্ষ্য নিয়ে মজুরি বোর্ডে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিলম্ব হবে না।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ও চলমান অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন এ বি এম শামছুদ্দিন ও আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার ও আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক নেতারা বলেন, গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মজুরিকাঠামো নির্ধারণে বর্তমান মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, পরিবারের মৌলিক চাহিদা এবং সামগ্রিক শিল্প পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।
এ জন্য কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত না নিয়ে দেশের সব শ্রমিক ফেডারেশন, কারখানাভিত্তিক ইউনিয়ন এবং সাধারণ শ্রমিকদের মতামতের ভিত্তিতে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি করা হবে বলেও জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের আটক এবং হয়রানির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বাবুল আখতার বলেন, মজুরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অজুহাতে অনেক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার দায়ে আটক শ্রমিক ও নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলা ও আইনি ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা।




