ঘরোয়া বাজারে চাপের মুখে বিদেশেই ভরসা খুঁজছে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতারা
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা, বিক্রির প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি আর চাহিদার চাপ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী করছে দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে বিওয়াইডি ও শাওমির সাম্প্রতিক বিক্রির পরিসংখ্যান চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বৈশ্বিক সম্প্রসারণের চিত্র তুলে ধরেছে।
রোববার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চীনের অন্যতম বৃহৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি টানা ষষ্ঠ মাসের মতো অক্টোবরে বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির গাড়ি বিক্রি ১১ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ৯০ হাজার ১৬৮ ইউনিটে পৌঁছেছে। তবে আগের মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে; সেপ্টেম্বরে বিওয়াইডির বিক্রি বেড়েছিল ১৭ শতাংশ।
অভ্যন্তরীণ বাজারের তুলনায় বিদেশে বিওয়াইডির সম্প্রসারণের গতি অনেক বেশি। অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটির বিদেশে গাড়ি সরবরাহ ১০২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ১৯৪ ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক বাজার এখন প্রতিষ্ঠানটির বিক্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমিও। স্মার্টফোন নির্মাতা হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অক্টোবরে তারা ৫০ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহ করেছে, যা চলতি বছরের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ। এর আগে আগস্টে ৩০ হাজারের বেশি এবং সেপ্টেম্বরে ৪০ হাজারের বেশি গাড়ি সরবরাহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে শাওমির মোট গাড়ি সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ইউনিটে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালে মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার গাড়ি সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম ১০ মাসের হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬১ শতাংশ পূরণ হয়েছে।
ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে সম্প্রসারণের পর চীনা গাড়ি নির্মাতাদের নজর এখন দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো এশীয় বাজারের দিকে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যারিসিউর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০ হাজারের বেশি গাড়ি বিক্রি করেছে বিওয়াইডি, যা দেশটিতে টয়োটা ও তাদের বিলাসবহুল ব্র্যান্ড লেক্সাসের সম্মিলিত বিক্রিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামের বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বৃদ্ধি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিওয়াইডির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শুধু বিওয়াইডি নয়, চীনের গিলি, চেরি ও এক্সপেংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সাফল্য পেলেও জাপানের বাজারে চীনা নির্মাতাদের পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন। দেশটির যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ডের অংশ মাত্র ৬ শতাংশ। স্থানীয় নির্মাতাদের শক্ত অবস্থান, হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা এবং চীনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০২৩ সালে জাপানের বাজারে গাড়ি বিক্রি শুরু করে বিওয়াইডি। বর্তমানে দেশটিতে প্রতিষ্ঠানটির ৭৫টির বেশি ডিলারশিপ রয়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সেখানে ৪ হাজারের কম গাড়ি বিক্রি করতে পেরেছে তারা; জাপানের মোট গাড়ির বাজারে বিওয়াইডির অংশ মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ।
জাপানে অবস্থান তৈরির জন্য বিওয়াইডি ছোট আকারের গাড়ির বাজারেও প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে চীনের চেরি-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান ইএমটি ২০২৭ সালে জাপানে কেই গাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে; স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে অসংখ্য ব্র্যান্ডের উপস্থিতি আর তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা নির্মাতাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশের বাজারকে প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা বাড়ানোর নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানগুলো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তুলনামূলক কম দাম আর ব্যাপক উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগিয়ে।



