গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে: উত্তোলনের বাকি মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, এলএনজি আমদানির ব্যয়ে বাড়ছে চাপ
দেশের উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) প্রমাণিত উত্তোলনযোগ্য মজুতের মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ৭৪ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। নতুন কোনো বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো থেকে আর সর্বোচ্চ আট বছর গ্যাস সরবরাহ পাওয়া সম্ভব হতে পারে বলে ভূতাত্ত্বিক ও জ্বালানি বিশ্লেষণে আভাস মিলছে।
সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুত ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ৭৪ টিসিএফ। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রায় ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়ে গেছে। বর্তমানে মজুত অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ, যা মূল মজুতের প্রায় ২৬ শতাংশ।
উৎপাদনের চিত্রও একই দিকে যাচ্ছে। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলো মিলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করত; ২০১৫ সালের মে মাসে তা সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭৮৬ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছিল। বর্তমানে সেই দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে — অর্থাৎ এক দশকে উৎপাদন কমেছে ৩৯ শতাংশের বেশি। বর্তমানে বার্ষিক গড়ে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। উৎপাদন হ্রাসের প্রধান কারণ পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে যাওয়া ও কার্যকর কূপে চাপ হ্রাস পাওয়া।
দেশের প্রধান গ্যাস সরবরাহকারী ক্ষেত্র বিবিয়ানায় এক দশক আগে দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ১৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে কমে প্রায় ৭৩২ মিলিয়ন ঘনফুটে ঠেকেছে। গত জুনের তথ্যমতে, মোট উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৫৭ শতাংশের বেশি (২৮ বিলিয়ন ঘনফুট) এসেছে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর পরিচালিত ৪২টি কূপ থেকে। বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর ৭০টি কূপ থেকে উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ২১ বিলিয়ন ঘনফুট।
উৎপাদনের এই তীব্র পতনের বিপরীতে দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক — সব খাতেই সরবরাহ সংকট চরম রূপ নিয়েছে।
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট হলেও তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়েও কেন্দ্রগুলোর অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অলস বসিয়ে রাখতে হয়।
শিল্প খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান স্থগিত থাকায় বর্তমানে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোতে প্রায় ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। গ্যাসনির্ভর বহু কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হতে বা বয়লার ও যন্ত্রপাতি রূপান্তর করতে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে আবাসিকে ২০১৫ সাল থেকেই নতুন সংযোগ বন্ধ রয়েছে এবং সঞ্চালন লাইনে চাপ স্বল্পতার কারণে পরিবহন খাতে সিএনজি সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চাহিদা ও জোগানের এই বিশাল ব্যবধান ঘোচাতে ২০১৮ সাল থেকে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু হয়। বর্তমানে দুটি ভাসমান টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা রয়েছে এবং মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহের ৩৫ শতাংশের বেশি মেটানো হচ্ছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
তবে দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে আমদানি করা এলএনজির ব্যয়ের পার্থক্য অত্যন্ত প্রকট। দেশীয় কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলনে প্রতি ঘনমিটারে খরচ পড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা। বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৩০ ডলার হলে আমদানিকৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২৭ টাকা — যা দেশীয় গ্যাসের খরচের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এশিয়ার বেঞ্চমার্ক মূল্য (জেকেএম) প্রতি এমএমবিটিইউ ৩২ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার কারণে জাতীয় বাজেটে এলএনজি আমদানির ভর্তুকি বরাদ্দ তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও প্রথম তিন মাসেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভর্তুকি ব্যয় নির্ধারিত বরাদ্দের কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘাটতি মেটাতে জ্বালানি বিভাগ ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ৫ হাজার ৮১৯ মিলিয়ন ঘনফুটে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৮ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাতারবাড়ীতে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার স্থলভিত্তিক টার্মিনাল ও কুতুবজোমে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন, ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ফেনী-বাখরাবাদ সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ এবং ১৫০টি নতুন কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে আরও তিনটি ভাসমান টার্মিনাল, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব এবং অতিরিক্ত আরও ১৫০টি কূপ খননের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি অফশোরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে সমুদ্রবক্ষে নতুন মজুত আবিষ্কার ও তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সময়সাপেক্ষ বিষয়, যার সুফল পেতে অন্তত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চমূল্যের অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আমদানিনির্ভর অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি অনাবিষ্কৃত ও অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো — যেমন ভোলা ও ছাতক পূর্বের মতো সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতে — দ্রুত উন্নয়ন ও অনুসন্ধানে কার্যকর জোর না দিলে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা গভীর সংকটে পড়তে পারে।

