জলবায়ুতে ঘরহারা বস্তিবাসীদের ১৩ দফা দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে, সংলাপে উঠল ৭০ শতাংশের গ্রামছাড়ার হিসাব

নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও খরায় ঘরবাড়ি হারিয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১৩ দফা দাবি জানিয়েছেন। ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরার বস্তিবাসীদের পক্ষে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন তালুকদারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবিসংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ আদায়ের দর-কষাকষিতে সরকারপ্রধান যেন এসব দাবি তুলে ধরেন, সে জন্যই এই স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলে সংলাপে জানানো হয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে 'জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর দরিদ্র মানুষের সংকট' শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে স্মারকলিপিটি দেওয়া হয়। বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) ও চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন (সিডব্লিউএফ) যৌথভাবে সংলাপটির আয়োজন করে এবং আয়োজকদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্মারকলিপির দাবির মধ্যে আছে জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শহর ও গ্রামের মানুষের জন্য অভিযোজন তহবিল নিশ্চিত করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো। কৃষকের শস্যবিমা ও পরিবেশবান্ধব কৃষিতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও করা হয়েছে।
দাবির তালিকায় আরও আছে নগরের নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের জন্য তহবিল এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) থেকে বাংলাদেশের মানুষের জন্য অর্থ দেওয়া। জলবায়ু তহবিল পাওয়ার শর্ত সহজ করা, স্থানীয় মানুষের কাছে জলবায়ু অর্থ সহজলভ্য করা এবং নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আলাদা বরাদ্দের দাবিও তালিকায় রয়েছে।
সংলাপে সিডব্লিউএফের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী একটি ধারণাপত্র পাঠ করেন। তাতে বস্তিবাসীদের পক্ষে আরও আট দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়—প্রান্তিক মানুষকে কেন্দ্রে রেখে নগর পরিকল্পনা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে শক্তিশালী করে আলাদা বাজেট দেওয়া এবং বাস্তুচ্যুতদের নিজ এলাকায় বা কাছের শহরে পুনর্বাসন।
সুপারিশে বস্তির ঘরের মানোন্নয়ন, তাপপ্রবাহ ও বন্যার আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং উচ্ছেদ বন্ধ করে স্থায়ী আবাসনের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আয়োজকদের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে সংলাপে বলা হয়, উপকূলে ঘূর্ণিঝড়, তীব্র লবণাক্ততা ও নদীভাঙন এবং উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘ খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে বস্তিবাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান ও রেমাল উপকূলের মানুষকে ঘরছাড়া করেছে।
সংলাপে জানানো হয়, এসব মানুষ এসেছেন ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন, বরিশাল, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও খুলনার কয়রা থেকে।
ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন বস্তির জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবারের প্রতিনিধিরা সংলাপে তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, গ্রাম ছাড়ার পর শুধু ঘরবাড়ি নয়, বহু বছরের চেনা জীবন ও সংস্কৃতিও হারিয়েছেন; শহরে এসে থাকতে হচ্ছে জরাজীর্ণ ঘরে, যেখানে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই।
প্রতিনিধিরা আরও জানান, গরমে তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, বর্ষায় নর্দমার নোংরা পানিতে চর্মরোগ এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে থাকতে হয় তাঁদের। দিনমজুর ও রিকশাচালকদের আয় অনিয়মিত, আর অপরাধের ভয় ও সমাজের অবজ্ঞা তাঁদের আত্মসম্মান কেড়ে নিচ্ছে বলেও তাঁরা জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন তালুকদার বলেন, নানা কারণে গ্রামের প্রান্তিক মানুষকে শহরে আসতে হচ্ছে এবং তাঁরা যেসব এলাকায় থাকেন, সেগুলোকে বস্তি বলা হয়। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মিলিত চেষ্টায় এসব মানুষের জন্য বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তাঁর মতে, বস্তিগুলোকে বহুতল ভবনে রূপান্তর করলে আরও বেশি মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে। সরকারের কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ স্বনির্ভর হবেন বলেও তিনি আশা করেন।
সংলাপে বাংলাদেশে জলবায়ু-বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আগের সতর্কতাও তুলে ধরা হয়। বিশ্বব্যাংকের 'গ্রাউন্ডসোয়েল' প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ুর প্রভাবে দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির আরেক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০১৯ সালেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দেশের প্রায় ৪১ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
বারসিকের পরিচালক মো. কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে সংলাপে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ বস্তিবাসী সুরক্ষা কমিটির সভাপতি হোসনে আরা বেগম রাফেজা, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কোষাধ্যক্ষ আমিনুল রসুল, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী, কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওরের (কাপ) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, সাংবাদিক নিখিল ভদ্র এবং বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক মিহির বিশ্বাস। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন বারসিকের সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম।



